বাণিজ্য ডেস্ক :
অস্বাভাবিক হারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নামমাত্র দাম কমার কোনো প্রভাব পড়েনি জনজীবনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুদূরপ্রসারী প্রভাব যাচাই-বাছাই না করে মূল্য সমন্বয়ের ফলে একদিকে যেমন কমলো সরকারের রাজস্ব, তেমনি লাঘব হয়নি ভোক্তার ওপর চাপানো বাড়তি বোঝাও। এদিকে, এখনও দাম বেশি স্বীকার করে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলছেন, বিশ্ববাজারের চাপে সরকার নিরুপায়।
চলতি মাসের শুরুতে এক ধাক্কায় নজিরবিহীনভাবে ৫২ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর জনমনে দেখা দেয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি শুল্ক কমিয়ে সোমবার (২৯ আগস্ট) আবারও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে সরকার। তবে মাসের শুরুতে যেখানে ডিজেল-কেরোসিনের দামবৃদ্ধির হার ছিল ৪২ শতাংশের বেশি, পেট্রোল-অকটেনে প্রায় ৫২ শতাংশ, সেখানে কমানোর হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। আর এতে হতাশ সাধারণ মানুষ বলছেন, মূল্য সমন্বয়ের বিস্তর এ ফারাকে লাভ হবে না খুব একটা।
জ্বালানি তেলে দাম কমার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে একজন ভোক্তা বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ, আমাদের আবার প্রতিক্রিয়া কী? ৪৬ টাকা বাড়ানোর পর ৫ টাকা কমালে তো হবে না। তেলের দাম যদি ১০০ টাকার মধ্যে থাকত, তাহলে আমাদের জন্য অনেক উপকার হতো।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সময় দেরি না করে গণপরিবহন মালিকরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করলেও দাম কমার বেলায় দেখা যায় ঠিক উল্টো চিত্র। জ্বালানি তেলের দাম কমার প্রভাব পড়েনি গণপরিহনসহ কোনোখাতেই।
এবিষয়ে একজন ভোক্তা বলেন, ৪৬ টাকা বাড়ানোর পর ৫ টাকা কমিয়ে তো সান্ত্বনা দেয়া হলো। এ সান্ত্বনায় মানুষ খুশি না।
আরেকজন ভোক্তা আক্ষেপ করে বলেন, ৫ টাকা কমানোর বিষয়টি হাস্যকর।
তবুও অনেকের আশা, জ্বালানি তেলের দাম ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে আসবে। যার প্রভাব পড়বে সবখানেই। তারা বলেন, দাম আরেকটু কমলে ভালো হতো। আশা করি, সরকার সেদিকে নজর দেবেন।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ে সূদুরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনায় নেয়া হয়নি। দাম কমার ইতিবাচক প্রভাব জনজীবনে না পড়ায় একদিকে কমবে সরকারের রাজস্ব, বিপরীতে লাভবান হবে ব্যবসায়ীরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, সরকার কিছু রাজস্ব হারাচ্ছে। আর সেটি চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের কাছে। এর মধ্যে ভোক্তা তো কষ্ট করেই যাচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম কমানোয় ভোক্তা উপকৃত হবে না।
এদিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন, জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষের জন্য এখনও বেশি। কিন্তু নিরুপায় হয়ে এ দাম রাখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম কমলো। আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশেও আমরা নিয়মিত মূল্য সমন্বয় করব। আমরা এখনও মনে করি, সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমান দামটাও একটু বেশি হয়ে যায়। সবার প্রতি অনুরোধ, একটু ধৈর্য ধরুন। আশা করি, এ কঠিন সময় খুব বেশিদিন থাকবে না। জনবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার কোনো অবস্থায়ই জনগণের কষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করতে চায় না। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের নিরুপায় হয়েই জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের পথ বেছে নিতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে ডিজেলের মূল্য প্রতি ব্যারেল ১৪৭ দশমিক ৬২ মার্কিন ডলার উল্লেখ করে নসরুল হামিদ বলেন, সে অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য পড়ে ১২৮ দশমিক ৬১ টাকা। অর্থাৎ ১০৯ টাকা ধরে ডিজেল বিক্রি করলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান হবে ১৯ দশমিক ৬১ টাকা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিগত ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি ২২ থেকে জুলাই ২০২২ পর্যন্ত) জ্বালানি তেল বিক্রয়ে (সব পণ্য) ৮০১৪ দশমিক ৫১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২৮ আগস্ট ডিজেলে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়।
