যশোর অফিস :
যশোরে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দাপটে কোনঠাসা হয়ে পড়ছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা। প্রতিদিনই কোন না কোন ইউনিয়ন থেকে সহিংসতার খবর আসছে। ইতিমধ্যে এক নৌকার প্রার্থী নিজেকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। তবে এতো ঘটনা ঘটলেও নিরব অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্র থেকে বিদ্রোহীদের ব্যাপারে হুসিয়ারি দিলেও যশোর এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
তৃর্ণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, যশোরে আওয়ামী লীগের গ্রুপ রাজনীতির বলি হতে যাচ্ছে নৌকা। চলমান তৎপরতা অব্যাহত থাকলে অধিকাংশ ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা পরাজিত হবেন।
যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, ‘আমরা বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাথে আলোচনা করছি। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্যদের সাথেও আলোচনা হচ্ছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনো বহিস্কারের সিদ্ধান্ত হয়নি। দেখা যাক কী হয়!’
আগামী ১১ নভেম্বর যশোরের ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন। আর ২৮ নভেম্বর ভোট হবে বাঘারপাড়া, শার্শা ও মণিরামপুর উপজেলার ইউনিয়নগুলোতে। এই নির্বাচনে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড থেকে দলীয় প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই অধিকাংশ ইউনিয়নে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। নৌকা ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেই এই হামলা, পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে।
জানা গেছে, আগামী ১১ নভেম্বর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই ১১ ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীর পাশাপাশি ১৩ জন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে আছেন। উপজেলার পাশাপোল, ধুলিয়ানী, সিংহঝুলী, জগদীশপুর, স্বরুপদাহ, নারায়নপুর ও সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের এই ১৩ বিদ্রোহী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য দুই দিন সময় বেঁধে দেয়া হয়। কিন্তু গত ২৮ অক্টোবরের উপজেলা আওয়ামী লীগের বেধে দেয়া সময় পার হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে চাঁপে পড়েছেন নৌকার প্রার্থীরা। এরই মধ্যে জগদীশপুর ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
এদিকে, এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সহিংসতার কবর আসছে ঝিকরগাছার ১১টি ইউনিয়ন থেকে। সোমবার প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন করে শিমুলিয়া ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মতিয়ার রহমান সরদার দাবি করেছেন, গত ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জহুরুল হকের নিজের গ্রামে নৌকা ভাঙচুর করে পুড়িয়ে দিয়েছেন। এসময় নৌকা প্রতীকের পোস্টার ছিড়ে তারা আগুন ধরিয়ে দেন।
তবে ওইদিনই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জহুরুল হক ও তার এক কর্মীকে মারপিট করেন নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা। তিনি যশোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এছাড়া পানিসারা ইউনিয়নে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ২৮ অক্টোবার সন্ধ্যায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নির্বাচনী পথসভা করতে বেজিয়াতলার মালোপাড়ায় গেলে বিদ্রোহী প্রার্থী জাকির হোসেন পিপুলের সমর্থকরা তার পথসভার চারপাশ ঘিরে কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালানো হয়। নৌকার প্রার্থীর গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। মোহীনিকাঠি বাজারে নৌকার নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। এ সময় বেশ কয়েকটি নৌকা পুঁড়িয়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়।
এই ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের সদস্য ঝরনা বেগম দাবি করেন, নৌকার নির্বাচন করার ‘অপরাধে’ তার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে।
শুক্রবার সকাল থেকেই বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা ইউনিয়ন জুড়ে সহিংসতা ছড়াচ্ছে, নৌকার অফিসে হামলা করছে।
পানিসারা ইউনিয়নে ২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহাজান আলী জানান, পানিসারার প্রায় সব জায়গায় নৌকার অফিস ভাংচুর করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা মীর বাবর জাহান বরুণ তাকে মোবাইল ফোনে নৌকার পক্ষে কাজ করলে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন।
গঙ্গানন্দপুর ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী শাহেদুর রহমান শিপলুলের প্রচার মাইক ভাঙচুর করা হয়েছে।
এছাড়া মণিরামপুর উপজেলার ১৬ ইউপিতের মধ্যে ছয়জন দাপটে চেয়ারম্যান মনোনয়ন পাননি। যাদের সবাই বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।
ইতিমধ্যে চালুয়াহাটি ইউপিতে নৌকার প্রার্থী উপজেলা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল ইসলামকে রাজাকারপুত্র আখ্যা দিয়ে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে হয়েছে বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি। চালুয়াহাটিতে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ সরদার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন।
বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে আছেন শ্যামকুড় ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি। ভোজগাতী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাকের মনোনয়ন না পেলেও আছেন মাঠে। এই ইউনিয়নে উপজেলা যুবলীগের যুগ্মআহবায়ক শরিফুল ইসলাম রিপনও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সভা-সমাবেশ করছেন। খানপুর ইউপি চেয়ারম্যান গাজী মোহাম্মদ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগে নেমেছেন। রোহিতা ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান আবু আনসার বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন।
এছাড়াও দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ পারভেজ, কুলটিয়া ইউনিয়নে কৃষকলীগের সভাপতি আদিত্য কুমার সরকার, হরিদাসকাটিতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির লিটন, মনোহরপুর ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান বিএম মোস্তফা মহিতুজ্জামান বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
অপরদিকে, শার্শা উপজেলার পুটখালী ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের গফফার সরদারের বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন নাসির উদ্দিন, উলাশী ইউনিয়নে নৌকা রফিকুলের বিপক্ষে বর্তমান চেয়ারম্যান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আয়নাল হক, শার্শা সদর ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান কবির উদ্দিন তোতার বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন, লক্ষণপুর ইউনিয়নে বর্তমান আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ও নৌকা প্রতীক পাওয়া আনোয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনের জন্য মাঠে নেমেছে শামছুর রহমান।
এছাড়া বাঘারপাড়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের পাঁচটিতে এবার নতুন প্রার্থী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। উপজেলার সব ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। যাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সোমবার জহুরপুর ইউনিয়নে নির্বাচনী সহিংসতার পাঁচজন গুরুতর আহত হন। মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাওয়ার সময় এক বিদ্রোহী প্রার্থীসহ তারা হামলার শিকার হন।
