হোম অর্থ ও বাণিজ্য স্মার্টফোনের বিক্রি কমে যাওয়া কি অর্থনৈতিক ধসের পূর্বাভাস দিচ্ছে?

বাণিজ্য ডেস্ক :

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীনের করোনা লকডাউনসহ বিশ্বের দেশে দেশে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পুরো বিশ্বে সম্ভাব্য একটি অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হচ্ছে এ সংকটের লক্ষণ। এ সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট আরও দৃশ্যমান হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি বাজার বিশ্লেষক ক্যানালিসের স্মার্টফোন বিক্রিবিষয়ক এক জরিপে।

চলতি বছর সারা বিশ্বেই আশঙ্কাজনক হারে কমেছে স্মার্টফোন বিক্রি। অথচ বিশ্লেষকরা ধারণা করছিলেন যে বিক্রি বাড়বে। এর জন্য ক্যানালিসের প্রতিবেদনে বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করা হয়েছে। পাশাপাশি স্মার্টফোন কেনাকাটার ধরনেও বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে কমদামি ও সাশ্রয়ী ফোন কেনার দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারা। এ তথ্যও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সোমবার (১৮ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে ক্যানালিস জানায়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সারা বিশ্বে স্মার্টফোন বিক্রি কমেছে ৯ শতাংশ। অথচ ২০২১ সালের একই প্রান্তিকে স্মার্টফোনের বিক্রি বেড়েছিল ১০ শতাংশেরও বেশি।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রথম দুই বছরে তুঙ্গে ছিল স্মার্টফোন, ট্যাব ও পিসির মতো প্রযুক্তি পণ্যের। মূলত কোভিডের সময় ঘরবন্দি মানুষের পেশাগত প্রয়োজন ও বিনোদন চাহিদা পূরণের জন্য স্মার্টফোনের চাহিদা রেকর্ড সর্বোচ্চ উঠে গিয়েছিল। বিষয়টি আমলে নিয়ে স্মার্টফোন নির্মাতা কোম্পানিগুলোও বাজারে নিত্যনতুন মডেলের হ্যান্ডসেট নিয়ে আসে।

কিন্তু বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় জরুরি প্রয়োজনীয় পণ্য বাদে ব্যয় কমাচ্ছে ভোক্তারা। সাশ্রয়ী ফোন কেনায় ঝুঁকছেন তারা। অবশ্য অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা যে প্রথম স্মার্টফোন ও প্রযুক্তিপণ্যের ওপর পড়বে, তা বোঝা যাচ্ছিল কয়েক মাস ধরেই।

গত মে মাসে চীনভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন (এসএমআইসি) চলতি বছর স্মার্টফোন বিক্রি ২০ কোটি ইউনিট হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছিল।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনে সাম্প্রতিক করোনা লকডাউনের প্রভাবে স্মার্টফোনের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল চীনভিত্তিক শীর্ষ চিপ নির্মাতা কোম্পানিটি।

হংকংভিত্তিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের সর্বশেষ মাসিক বিক্রির উপাত্তে দেখা গেছে, গত মে মাসে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বিক্রি হয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট। এর মাধ্যমে গত এক দশকের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ১০ কোটি ইউনিটের নিচে নেমে আসে স্মার্টফোন বিক্রি।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বে ৩১ কোটির বেশি স্মার্টফোন বিক্রি হলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি ৫০ লাখ ইউনিটে। গত বছরের একই প্রান্তিকে স্মার্টফোন বিক্রি হয়েছিল ৩১ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট।

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করা, ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট প্রলম্বিত হওয়া, শীর্ষ অর্থনীতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন রূপ পাওয়ায় চলতি বছর স্মার্টফোন, পিসিসহ ভোক্তা খাত সবল হওয়া নিয়ে আশাবাদী নয় অনেকেই।

এ ব্যাপারে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষক টবি ঝু বলেন, গ্রাহক চাহিদা হ্রাস পুরো স্মার্টফোন সরবরাহ চেইনের জন্যই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শীর্ষস্থানীয় মেমোরি চিপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাইক্রন টেকনোলজিসের এক পূর্বাভাসেও স্মার্টফোন বিক্রি কম হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ভোক্তা চাহিদা কমার ফলে চলতি বছর প্রায় সব স্মার্টফোন বিক্রেতা কোম্পানিরই বিক্রি কমবে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

মাইক্রনের সিইও সঞ্জয় মেহরোত্রা জানান, চলতি বছরে স্মার্টফোন বিক্রি গত বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ কমতে পারে। যদিও চলতি বছরে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল, স্মার্টফোন বিক্রি আগের বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ বাড়ার।

বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরা বলছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ কিংবা ২০২৩ সাল নাগাদ বৈশ্বিক চিপ স্বল্পতা বহাল থাকবে।

এদিকে ক্যানালিসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দামে সাশ্রয়ী গ্যালাক্সি এ সিরিজের স্মার্টফোনে ভর করে ২১ শতাংশ মার্কেট শেয়ার ধরে রেখেছে বিশ্বের শীর্ষ স্মার্টফোন বিক্রেতা দক্ষিণ কোরিয়ার স্মার্টফোন জায়ান্ট স্যামসাং।

অপরদিকে আইফোন ১৩ এখনও চাহিদার শীর্ষে থাকায় ১৭ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে বিশ্বে স্মার্টফোন বিক্রির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অ্যাপল।

অপরদিকে করোনাজনিত লকডাউনের কারণে ধুকছে শাওমি, অপো ও ভিভোর মতো চীনের শীর্ষ ব্রান্ডগুলো। তিনটি ব্রান্ডেরই মার্কেট শেয়ার কমে গেছে।

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন