আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
ইউক্রেনে অভিযানের শুরুতেই চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। গত ২৪ ফেব্রুয়ারির ঘটনা এটি। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী যাতে কেন্দ্রটিতে কোনো নাশকতা করতে না-পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে রুশ বাহিনীকে। প্রতিবেশী দেশটিকে নিরস্ত্রীকরণ করতে এদিন সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।-খবর এবিসি নিউজের
ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সরবরাহ ফের সচল করা হয়েছে। পূর্ব-ইউরোপের দেশটির বৈদ্যুতিক গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চেরনোবিলের বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন। গেল ৯ মার্চ সংঘাতের সময় বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এখন মেরামতের কাজ চলছে। বর্তমানে বাইরে থেকে ডিজেল জেনারেটর দিয়ে কেন্দ্রটির চুল্লি পরিচালনা করা হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলীয় ইউক্রেনের পরিত্যক্ত ভুতুড়ে শহর প্যারিফাটের কাছে অবস্থিত চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্র। ১৯৭২ সালের ১৫ আগস্ট কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ শুরু করে তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন। ইউক্রেন তখন সোভিয়েত অংশ ছিল। ১৯৮৩ সালের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারটি চুল্লির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মালিকানা ইউক্রেনের হাতে চলে যায়। কিয়েভের জ্বালানিমন্ত্রী জার্মান গ্যালুশেঙ্কো বলেন, আমরা বিশেষজ্ঞদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। চেরনোবিল পারমাণবিক চুল্লিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ সক্রিয় করা হয়েছে।
দুপক্ষের তুমুল লড়াই শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চেরনোবিল বিদ্যুৎ চুল্লির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে রুশ বাহিনী। এরপর চুল্লির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। ইউক্রেনের বিজ্ঞানী ও কর্মীরা সেখানে কাজ করছেন।
চেরনোবিলের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের কথা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) জানিয়েছিল ইউক্রেন। আইএইএ বলছে, চুল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিপজ্জনক না। ভয়াবহ কিছু ঘটার আশঙ্কা কম।
চেরনোবিলে বিদ্যুৎ চুল্লির সত্যিকার নাম ভ্লাদিমির লেনিন পারমাণবিক চুল্লি। ১৯৮৬ সালের এপ্রিলে চেরনোবিল বিদ্যুৎ চুল্লিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটেছিল।
এতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। পুরো ইউরোপজুড়ে তার তেজস্ক্রিয় উপাদানের মেঘ ছড়িয়ে পড়েছে। চার নম্বর চুল্লিতে বিপর্যয় ঘটেছিল। দুর্ঘট্নার পরে বাকি তিনটি সচল থাকলেও ২০০০ সালের দিকে কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চেরনোবিল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রকৌশল পুকুরের মাধ্যমে শীতল করা হয়েছিল, যা ডাইপারের সঙ্গে প্রিপিয়াত নদীর মোহনা থেকে উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৫ কিলোমিটার থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।
এটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের তৃতীয় আরবিএমকে পামাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ইউক্রেনের মাটিতে এটিই ছিল প্রথম কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। কার্টেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশল বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্সেই মুরাভিভ বলেন, সীমান্তের কাছে চেরনোবিল একটি কৌশলগত সম্পদ। যে কারণে সবার আগে এটি দখলে নিয়েছে রুশ বাহিনী। তারা এটির সুরক্ষা দিতে চায়। চেরনোবিলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। তারা চাচ্ছে, এখানে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
তিনি বলেন, রুশ বাহিনী চাচ্ছে না যে ইউক্রেনীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত চার নম্বর চুল্লিটি বোমা মেরে উড়িয়ে দিক। ১৯৮৬ সালেও চুল্লিটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছিল। রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখে দিতে চুল্লিটিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকাটি দূষিত করে দিতে পারে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। এমন আশঙ্কা আগে থেকেই করে রেখেছিল রাশিয়া।
এএনইউ’র স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেনস স্টাডিজ সেন্টারের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক জন ব্ল্যাক্সল্যান্ড বলেন, ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ যাওয়ার পথে হওয়ায় চেরনোবিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এ কারণেই শুরুতে এটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। আপনি যদি বেলারুশ থেকে, উত্তর দিক থেকে আসেন, অনেকটা রুশ কোণ থেকে, বেলারুশ, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার সীমান্তে আপনাকে চেরনোবিল হয়ে যেতে হবে। এটি কিয়েভ নিয়ন্ত্রণের পথ তৈরি করে দেবে।
অস্ট্রেলিয়ার স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস বলেন, চেরনোবিলের কাছে যে কোনো সংঘাতে পরমাণু বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়েছে। যে কারণে পরমাণু কেন্দ্রটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এটিকে নিরাপদ রাখতে চাচ্ছে মস্কো।
