নড়াইল অফিস :
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার আটলিয়া গ্রামের ২৯ বছরের ঝুমা বেগম। সদ্যজাত সন্তাকে আদর তো দুরে,কোলে নেবার সামর্থ ও নেই। জরায়ু কেটে নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় বাবার বাড়ির বিছানায় শুয়ে অঝোরে কাদছেন। নিজের ভবিষৎ দাম্পত্য জীবনের দূশ্চিন্তায় আর ৩য় দফা অপারেশন করতে হবে এই শংকায় দিন কাটছে।
ঝুমা বেগমের সাথে কথা বলতে গেলে তার মুখ দিয়ে স্বর বের না হয়ে দুচোখ বেয়ে অশ্রæ গড়িয়ে পড়লো। কান্না জড়িত কন্ঠে জানান,আমি কোনদিন মা হতে পারবো না, কোনদিন উঠে দাড়াতে পারবো কিনা তাও জানিনা। আমাকে আগের অবস্থায় কি ফিরিয়ে দিতে পারবেন ডাক্তার আকরাম। আমি ডাক্তারকে ডাকলাম কিন্তু উনি ফ্লাইটের তাড়া থাকায় আমাকে একটিবারও দেখলেন না।
নড়াইলের ক্লিনিকগুলো প্রসূতি মায়েদের জন্য মৃত্যুফাদ। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অপচিকিৎসায় ভূক্তভোগীরা প্রতিকার চেয়ে পাবেন না এই আশংকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আপোষ মিমাংশা করেন। বছরের পর বছর ধরে অদক্ষ আর অনুন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা চলছেও অদৃশ্য কারনে ক্লিনিকগুলোর ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয় না প্রশাসন,ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যান ক্লিনিক মালিকেরা।
নড়াইল শহরের ভওয়াখালী গ্রামের খন্দকার মাহফুজ নুর। সন্তানসম্ভাবা স্ত্রী ঝুমাকে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ভর্তি করেন শহরের ইমন ক্লিনিকে। অপারেশনে বাচ্চা প্রসবের পর থেকে রোগীর যন্ত্রনা শুরু হয়,এরপর প্র¯্রাবের রাস্তা দিয়ে বের হতে থাকে রক্তধারা। এই অবস্থায় চিকিৎসা না দিয়েই জোর করে ক্লিনিক থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়। ২৪ ডিসেম্বর আল্ট্রাাসনো করে পেটের ভিতরে জমাট বাধা রক্ত দেখা যায়। স্ত্রীকে বাচাতে খুলনার একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলে জানতে পারেন ঝুমার পেটের ভিতরে পচন ধরায় জরায়ু,প্রস্্রাবেন নালী কেটে ফেলতে হবে। জরুরী ভিত্তিতে ২য় দফা অপারেশন করা হয় ঝুমার। কয়েক দফায় ৪ লক্ষ টাকা খরচ করলেও স্ত্রী ঝুমা রয়েছেন আশংকাজনক অবস্থায়। প্রতিকার চেয়ে ক্লিনিকের দুই মালিক আর চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ২৫ জানুয়ারী আদালতে মামলা করেছেন।
[ডিসেম্বর মাসে ইমন ক্লিনিকে ভওয়াখালির মৌসুমী খানম এর সিজার অপারেশনের ৫দিন পর সেলাই কাটতে গিয়ে দেখা গেল কোন সেলাই লাগেনি। সন্তান প্রসবের পর তার তলপেটে যন্ত্রনা বাড়তে থাকে। ক্লিনিকে অভিযোগ জানালে ক্লিনিকের লোকেরা এসে কয়েক ডোজ ব্যাথার ইনজেকশন দিয়ে পরে আবার কেটে তলপেট সেলাই করেন। স্বামী তিতাসের অভিযোগ,ইমন ক্লিনিক সহ অনেক ক্লিনিকে কমদামী সুতা ব্যবহার হয়,কোথাও ডাক্তার নাই এমনকি নার্সও নাই,সম্পূর্ন খামখেয়ালীতে চলছে চিকিৎসা।
ইমন ক্লিনিকে মা হতে এসে আরো করুন অবস্থা হয়েছে দিঘলিয়ার সুজয় ঘোষের স্ত্রী সুপ্রিতী ঘোষ এর। অপারেশন হবার পরে তার শরীরে ইনজেকশন পুশ করে একজন আয়া,যে ইনজেকশন ধীরে ধীরে অর্ধেক অ্যাম্পুল শরীরের পুশ করার কথা আয়া ঐ ইনজেকশন পুরোটাই একবারেশরীরে পুশ করেন। এতে সুপ্রিতী ঘোষ এর মুখে ফেনা উঠে মরমর অবস্থা হলে জরুরীভাবে তাকে খুলনার একটি বেসরকারী হাসপাতালের আইসিইউ তে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর ধীরে ধীরে সুস্থ্য হলেও আশংকা কাটেনি ঐ নারীর।
সুজয় ঘোষের অভিযোগ, ইমন ক্লিনিকে কোন ডিপ্লোমা নার্স নেই,আয়ারাই নার্স। ক্লিনিক মালিকের স্ত্রী নার্স না হয়েও অপারেশন থিয়েটারে থাকেন।পারিবারিক সব কাজই চলে অপারেশন থিয়েটারে। নিজেদের ডিসপেন্সারী থেকে ঔষধ বিক্রি আর রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করলেও এখানে সেবার বদলে বাজে চিকিৎসা পাওয়া যায়।
৩ বছর আগে একই রকমভাবে ইমন ক্লিনিকে মা হতে এসে আজো যন্ত্রনায় ভূগছেন চাচুড়ি গ্রামের ৩০ বছরের সুমনা বেগম।
সরেজমিন ইমন ক্লিনিকে ঘুরে কোন প্রশিক্ষত নার্স পাওয়া গেল না,কয়েকজন আয়াকে নার্স সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ক্লিনিক মালিকের স্ত্রী শিল্পি বেগম দ্রুত প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে ছুটে আসেন। অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে পর্দা দিয়ে আড়াল করে অন্যান্য আসবাপত্র রাখা হয়েছে।প্রত্যেকটি রোগীর প্রেসক্রিপশনে ২০/২২ টি করে ঔষধ লেখা আছে। কয়েকমাস হলো বেসরকারী একটি কলেজ থেকে সদ্য পাশ করা একজন আবাসিক চিকিৎসক থাকলেও তার রুমের সামনে কোন নেমপ্লেট দেখা গেল না। মালিক সরোয়ার হোসেন এরপরই নীচ থেকে দোতলায় আসেন। কিছুটা হম্বিতম্বি করার চেষ্টা করলেও পরে থেমে যান। কয়েকজন সাংবাদিককে ফোন করেন ক্লিনিকে আসার জন্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বললেন, রাত হলে ক্লিনিকের ৪ তলায় নারী এবং অন্য আসর বসে।
অপারেশ থিয়েটারে নিজের সবসময় থাকার কথা স্বীকার করে বলেন,আমাদের ক্লিনিক তো তাই রোগীর ভালমন্দ দেখার জন্য ক্লিনিকে থাকি। অভিযোগ আছে অপারেশ চলাকালীন শিশু সন্তানকে তিনি অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে ভাতও খাওয়ান,যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
আবাসিক চিকিৎসক ডা.সপ্নীল আকাশ চিকিৎসার নানা সমস্যা বিষয়ে নিজেদের দায় স্বীকার করে বললেন,সবসময়তো এ ধরনের ঘটনা ঘটে না এটা অনেকটাই অনাকাংক্ষিত।
ক্লিনিক মালিক সরোয়ার হোসেন একটি মাত্র ভূল চিকিৎসার কথা স্বীকার করলেও বাকিগুলো রোগীদের উপর দায় চাপিয়ে বলেন,রোগীরা অচেতন ভাবে চলাফেরার কারনে ভোগে,আবার প্রেসার বেড়েও অসুস্থ্য হতে পারে। এসবই নির্ভর করে উপরওয়ালার উপর।
ডিভাইন ক্লিনিক মালিক ডা.শামীম আক্তার বলেন,একটি ক্লিনিকে সার্বক্ষনিক চিকিৎসক এবং নার্স আব্যশক থাকতে হবে। কোন কোন ক্লিনিকের চিকিৎসার গাফিলতির জন্য আমাদের সব ক্লিনিকের যেমন দূর্নাম হয় তেমনি প্রসূতি মায়েরা দীর্ঘ রোগে ভোগেন।
বেসরকারী ক্লিনিকও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এসেনিয়েশন সাধারন সম্পাদক এস এম সাজ্জাদ রহমান বলেন,আমরা নিয়মিত মাসিক মিটিং করি,ক্লিনিকগুলোর কোন দূর্বলতা থাকলে সেগুলো সংশোধনের জন্য বলা হয়।
শুধু ইমন ক্লিনিকই নয়,নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে চলা মর্ডান সার্জিক্যাল ক্লিনিক,লোহাগড়ার মা সার্জিক্যাল ক্লিনিক,আল ইসলামিয়া ক্লিনিক,মোর্শেদা ক্লিনিক,মিজানুর নার্সিং হোম। ক্লিনিকের নিয়ম না মানা কালিয়ার,কালিয়া সার্জিক্যাল ক্লিনিক। এছাড়া শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক ক্লিনিক আর বড়দিয়ার হাজী খান রওশন আলী হাসপাতাল লাইসেন্স ছাড়াই গত ৩ বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে ৬০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার এর বেশিরভাগই লাইসেন্স হালনাগাদ নাই। ৪টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রক্রিয়াধীন,৯টি লাইসেন্সবিহীন ডায়াগনষ্টিক সেন্টার বহাল তবিয়তে চালু রয়েছে। এই অবস্থায় নতুন আরো ৪টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স এর জন্য আবেদন করেছে।
নড়াইলের স্বাস্থ্য সেবা গ্রহীতা ফোরামের আহবায়ক কাজী হাফিজুর রহমান বলেন,প্রায় ২০ বছর ধরে নড়াইলে অবৈধ ক্লিনিক ব্যবসা চলছে,সি এস সাহেবরা এসেই দুই মাসের মধ্যে ঠিক করে ফেলবেন বলেন কিন্তু কোন কারনে কিছুই করেন না ঠিক বোঝা যায় না।
নড়াইলের সিভিল সার্জন ডা.নাসিমা আকতার গতানুগতিক ধারায় বললেন,লাইসেন্স না থাকলে সেই ক্লিনিক গুলো আমরা বন্ধ করে দেব। মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কয়েকটি মামলা এসছে এগুলো আমরা তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেব।
s
