জাতীয় ডেস্ক :
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। সবশেষ গত ২৪ অক্টোবর বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে হানা দেয় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। পূর্বপ্রস্তুতি থাকায় প্রাণহানি কম হলেও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই বারবার এসব দুর্যোগ বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে হানা দিচ্ছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, ঘূর্ণিঝড়সহ ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এ বিষয়ে এখনই পরিকল্পিত ব্যবস্থা না নেয়া হলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য খারাপ দিন অপেক্ষ করছে।
তারা বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিন হাউস গ্যাস ১ শতাংশেরও কম নিঃসরণ করে বাংলাদেশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির দিক দিয়ে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অন্তত ১০-১৫ শতাংশ বেড়েছে, যার পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। গত ৬০ বছরে ছোট-বড় অন্তত ৩৩টি ঘূর্ণিঝড় এ দেশে আঘাত হেনেছে। শুধু শেষ ১৫ বছরে আঘাত হেনেছে অন্তত ৯টি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়।
কেন এত দুর্যোগ, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত সবশেষ জলবায়ু সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা, ঝড়, দাবানলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। ফলে মানবজাতির অর্ধেকই চরম বিপদের মধ্যে পড়েছে। এ জন্য আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের অভ্যাস বদলাতে হবে। তা না হলে কোনো দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারবে না।
গুতেরেস বলেন, আমাদের সামনে দুটি বিকল্প থেকে একটি বেছে নেয়ার সুযোগ আছে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে হয় একযোগে উদ্যোগ নিতে হবে, নয়তো একসঙ্গে আত্মহত্যা করতে হবে।
জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড মেটেওরোলজিক্যাল সংস্থা বলছে, প্রাকৃতিক এ বিপর্যয়ের মূল কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।
একটা বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে, যে প্রাকৃতিক দুর্যোগই হচ্ছে, সেটা আগের চেয়ে অনেক ভয়াবহ হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, পানির উষ্ণতা বাড়ছে, বায়ুমণ্ডলে বেশি পানি বাষ্পীভূত হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল হাসান বলেন, গত ৩০ বছরের আবহাওয়ার রেকর্ড যদি আমরা দেখি, সেখানে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে গেছে। বেড়েছে গড় তাপমাত্রা। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সমুদ্রের ঘূর্ণিঝড় এবং টর্নেডোর একটা সম্পর্ক আছে। আর এ কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘূর্ণিঝড় আগের কয়েক দশকের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। পূর্বাভাস, যোগাযোগ ও প্রস্তুতি ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে প্রাণহানি কমেছে। কিন্তু ঝড়গুলোর প্রভাব গিয়ে পড়ছে ফসল, গাছপালা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর।
অন্যদিকে ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়কে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত বলতে রাজি নন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের পূর্বপর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্র খুঁজে পাননি। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের সম্পর্ক রয়েছে।
আইনুন নিশাত বলেন, সাধারণত সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ২৬-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে সেখানে দ্রুত বাষ্পীভবন ঘটে এবং বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। ফলে আশপাশের অঞ্চল থেকে বাতাস সেখানে প্রবাহিত হতে শুরু করে। এভাবে ওই এলাকায় একটি নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়, যা থেকে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড়ের।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাধারণত মার্চ, এপ্রিল, মে, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। এই ঘূর্ণিঝড় শত বছর আগেও ছিল। এটাকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলাটা ঠিক হবে না; বরং এটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে ঘূর্ণিঝড় বেড়েছে কি না, সেটি অবশ্যই আমলে নেয়ার মতো, যোগ করেন তিনি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে ক্ষতি ৩০ হাজার কোটি টাকা
চলতি বছরের মার্চে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) একটি জরিপের তথ্য প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, গত ছয় বছরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ৭৯ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। এই হিসাব শুধু দুর্যোগপ্রবণ এলাকার। সারা দেশের হিসাব করা হলে সেটি আরও অনেক বেশি হবে। জরিপের তথ্যমতে, প্রাকৃতি দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষিখাতে ৫২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতি শস্যখাতে ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ।
যদিও এ জরিপের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
অন্যদিকে চলতি বছরের অক্টোবরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখেরও বেশি মানুষ। আশঙ্কা করা হয়, সামনের বছরগুলোতে এ হার দ্রুত আরও বাড়বে, যা ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
এ ছাড়া গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) এক গবেষণায় বলা হয়, গত ৫০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পৃথিবী। এ সময়ে বন্যা ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগগুলো বেড়েছে অন্তত পাঁচগুণ। মৃত্যু হয়েছে ২০ লাখেরও বেশি মানুষের, ক্ষতি হয়েছে ৩ দশমিক ৬৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৭৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ১১ হাজারের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি এসব তথ্য জানায়।
পাশাপাশি ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় অনুমান করা হয়, ২০৫০ সালের মধ্যে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার ৪ কোটি মানুষ জলবায়ুজনিত উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে।
কয়েক দশকে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়
ভারত মহাসাগরের আশপাশের দেশগুলোতে ঘূর্ণিঝড় নতুন কিছু নয়; বরং হাজার বছরের প্রাকৃতিক ঘটনা। তবে জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিগত কয়েক দশকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে, যার পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন।
এখানে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে আঘাত হানা বড় ঘূর্ণিঝড়গুলো হচ্ছেঃ
১৯৭০ সালের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশে আঘাত হানে মারাত্মক একটি ঘূর্ণিঝড়। ঝড়ে সে সময় পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল; ফসলের ক্ষতি ছিল হিসাবের বাইরে।
১৯৮৫ সালের ২৪ ও ২৫ মে চট্টগ্রামের উড়িরচরে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ১১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
১৯৮৮ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ৫ হাজার ৭০৮ জন প্রাণ হারান। এ ছাড়া এর প্রভাবে দেখা দেয় সর্বনাশা বন্যা।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। এতে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই ঘূর্ণিঝড়কে আখ্যা দেয়া হয় ‘শতাব্দীর প্রচণ্ডতম ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবে। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ কোটি মানুষ।
১৯৯৭ সালের ১৯ মে সীতাকুণ্ডে ২৩২ কিলোমিটার বেগে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এতে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়।
২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ ২২৩ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে। খুলনা-বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় ১৫-২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়। রেডক্রসের হিসাবে ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হলেও সরকারিভাবে ছয় হাজার বলা হয়। ঝড়ে সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
২০০৯ সালের ২৫ মে ৭০-৯০ কিলোমিটার বেগে উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আইলা। ঝড়টি দেশের ১৯৩ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে উপকূলে প্রায় তিন লাখ মানুষ গৃহহীন হয়।
ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ ২০১৩ সালের ১৬ মে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানে। এটির গতি ছিল ১০০ কিলোমিটার। এই ঝড় দেশের ১৭ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়।
২০১৭ সালের ৩০ মে কক্সবাজারে ১৪৬ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় মোরা। এর তাণ্ডবে হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। কক্সবাজার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জমির ফসল এবং লবণ চাষিদের মজুত লবণ নষ্ট হয়ে যায়। দুজন নারীসহ নিহত হন তিনজন।
২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলে আঘাত হানে ফণী নামে একটি ঘূর্ণিঝড়। ঝড়ে ২ হাজার ৩৬৩টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ এবং ১৮ হাজার ৬৭০টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফণীতে ৬৩ হাজার ৬৩ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২১.৯৫ কিলোমিটার বাঁধ ভয়াবহভাবে ক্ষতির শিকার হয়। নিহত হন কমপক্ষে ৫ জন। বাস্তুচ্যুত হন দুই দেশের ৩৫ লাখ মানুষ। ঘূর্ণিঝড়বিষয়ক বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৫২ বছরে দেশে যত ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে, ফণীর স্থায়িত্ব ও বিস্তৃতি ছিল সবচেয়ে বেশি।
ফণীর প্রভাব না-কাটতেই একই বছরের নভেম্বরে উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন ২০ লাখ মানুষ, প্রাণ হারান কমপক্ষে ১৭ জন। এ ছাড়া নষ্ট হয় ২ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল, ভেসে যায় ৪৭ কোটি টাকার মাছ। বিধ্বস্ত হয় হাজার হাজার ঘরবাড়ি।
২০২০ সালের মে মাসে দেশে আঘাত হানে আম্পান। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৬ জেলার কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের সম্পদ। ১ লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। মারা যান কমপক্ষে ২১ জন। ঝড়টি সম্পর্কে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এত দিন ধরে আমরা ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব এলাকা বলতে উপকূলকে বুঝতাম। কিন্তু আম্পান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ থেকে দেশের কোনো এলাকাই মুক্ত নয়।
২০২১ সালের ২৬ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। এতে দেশের ১ লাখ ২০ হাজার ৭১২টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিধ্বস্ত হয় ৫৩ হাজার ৪৩৪টি ঘরবাড়ি এবং ৯ হাজার ১৯১ হেক্টর ফসলি জমি, ২ হাজার ১৯৯ হেক্টর মৎস্য ও চিংড়ি ঘের। পাশাপাশি ৫ হাজার ৬২৭ দশমিক ১৯ কিলোমিটার বাঁধের ক্ষতি হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইয়াসের আঘাতে মোট ২ হাজার ৯৫১ কোটি ৭০ লাখ ৩০ হাজার ৬২৭ টাকার ক্ষতি হয়। জীবন-জীবিকার তাগিদে অন্যত্র পাড়ি জমাতে বাধ্য হন তাদের অনেকেই।
এ ছাড়া নার্গিস, কোমেন, রোয়ানু, জাওয়াদ প্রভৃতি নামে আরও বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাগরতীরের বেশ কয়েকটি দেশে আঘাত হানে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে, যা আলোচনায় আনা হয়নি।
সিত্রাংয়ের আঘাত ও ক্ষয়ক্ষতি
সবশেষ গত ২৪ অক্টোবর উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। যার প্রভাবে রাজধানীসহ দেশের অন্তত ২০ জেলায় মানুষ, ঘরবাড়ি, ফসল ও গবাদি পশু-পাখির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাড়ি ও উন্মুক্ত স্থান বিশেষ করে পার্ক ও সামাজিক বনায়ন হয়েছে এমন এলাকায় অসংখ্য গাছ উপড়ে পড়েছে।
সিত্রাংয়ের পরদিন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান জানান, সিত্রাংয়ের প্রভাবে বিভিন্ন জেলায় ঘরের নিচে চাপা পড়ে, গাছচাপায়, পানিতে ডুবে, নৌযান ডুবে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন নারী, ৪টি শিশু।
এ ছাড়া ঝড়ে ঘরবাড়ি, চিংড়ি ঘের, পুকুর ও কৃষকের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, ঝড়ে দেশের ৪১৯টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আনুমানিক ১০ হাজার ঘরবাড়ি। ১৯ জেলায় ভেঙে পড়েছে হাজার হাজার গাছ। এ ছাড়া ৬ হাজার হেক্টর ফসলের জমি নষ্ট হয়েছে এবং ১ হাজার মাছের ঘের ভেসে গেছে। মাঠে থাকা আমন ও শীতকালীন সবজির ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পথে বসার জোগাড় হয়েছে কৃষকের। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার বাঁধ।
এ ছাড়া ৭ ফুট উচ্চতার অস্বাভাবিক জোয়ারে ভেসে গেছে চরাঞ্চলের কয়েক হাজার গরু, মহিষ ও হাঁস-মুরগি। ঘাটে নোঙর করা শতাধিক ট্রলার ভেঙে গেছে। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন দরিদ্র মানুষ।
২৫ অক্টোবর বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের ব্যাপক আঘাতে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ৮০ লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ।
এই সবকিছুই তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির পরিমাণ জানতে হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু তারপরও বলা যায়, সিত্রাংয়ের আঘাতে প্রাণহানি কিছুটা কম হলেও আর্থিক ক্ষতির হিসাব একেবারে কম নয়।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই
জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বিজ্ঞানীদের দাবি, শুধু অসতর্কতার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, এই দশকের শেষের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। এখনকার সময়ের চেয়ে ১৪ গুণ বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবে তখন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে, তাতে সন্দেহ নেই; যার একমাত্র কারণ মানুষ।
আর বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, তেমনটা হলে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র, প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা দেশের জন্য যে তা মহাবিপর্যয় সেটি বলাই বাহুল্য।
আবহাওয়া অধিদফতরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার গণমাধ্যমকে বলেন, আবহাওয়ার চক্রে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির প্রবণতা কোনো কোনো দশকে হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। ১০ বছর ধরে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছর একটি করে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। এর আগে আশি ও নব্বইয়ের দশকে দেখা গেছে, প্রতি তিন-চার বছরে একটি করে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানত।
তবে ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আমরা দেখলাম প্রতিবছর এক বা একাধিক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। এমনও হতে পারে, বাংলাদেশে এখন থেকে প্রায় প্রতিবছর একটি বা একাধিক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে। ফলে আমাদের এ ধরনের দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদে প্রস্তুতিই কেবল ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে অধ্যাপক মনজুরুল হাসান। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নষ্ট করার মতো সময় আর বাংলাদেশের হাতে নেই।
ড. মনজুরুল বলেন, এমনিতে ঘূর্ণিঝড় হয়তো আবহাওয়াগত একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বর্তমান সময়ে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের সব কটি মোটেও স্বাভাবিক বলা যায় না; বরং একটি একটি সতর্কবার্তা। এখন সময় নষ্ট করলে বাংলাদেশের জন্য খুব খারাপ হবে তাতে সন্দেহ নেই।
