মোহাম্মদ আরীফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ :
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে ইউপি নির্বাচন ঘিরে কুলিয়ারচর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের মধ্যে চরম বিভক্তি দেখা দিয়েছে। কুলিয়ারচর উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে তৃতীয় ধাপে ৫ ইউপিতে ২৮ নভেম্বর ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই ৫টি ইউপির মধ্যে সব কয়টি ইউপিতে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ সংগঠনের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামতে শুরু করেছে। ফলে সব কয়টি ইউপিতে নৌকার ভরাডুবি আশঙ্কা করছে সাধারণ মানুষ।
কুলিয়ারচর ৭ নং ইউনিয়নে মনোনয়ন পেয়েছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী যুব লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহমদ এর ভাতিজা এস.এম আজিজুল্লাহ। কিন্তু তিনি নৌকা মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে উক্ত ইউনিয়নের উপজেলা কমিটির সকল নেতৃবৃন্দ নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর পক্ষে সভা সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন।
আরও ভয়াবহ চিত্র ৬নং সালুয়া ইউনিয়নে। এখানে মনোনয়ন পেয়েছে সাবেক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ছেলে মোঃ কাইয়ুম। তিনি মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ ও ইউনিয়নের মধ্যে উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দের মধ্যে চরম ক্ষোভ লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি উপরে উপরে কিছুটা স্বাভাবিক হলেও, নৌকার পাশে নেই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী।
একই চিত্র ৫নং ছয়সূতী ইউনিয়নেও। এখানে মনোনয়ন পেয়েছে কুলিয়ারচর সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি ইকবাল হোসেন। তিনি মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে তৃণমূল আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করতে দেখা গেছে। এই ইউনিয়নেরও নেতৃবৃন্দকে প্রকাশ্যে নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামতে দেখা যাচ্ছে।
৪নং উছমানপুরের চিত্র আরও ভয়াবহ। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এই ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ভোটার। কিন্তু তিনিও নেই নৌকা প্রার্থীর পক্ষে। এছাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকও নৌকা প্রার্থী মোঃ নিজাম ক্বারির পক্ষে নেই।
১নং গোবরিয়া- আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নেও একই চিত্র। এই ইউনিয়নে মনোনয়ন পেয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ এনামুল হক। তিনি মনোনয়ন পাওয়ার পর মনোনয়ন পরিবর্তনে সংবাদ সম্মেলনও হয়েছে। এখানেও নৌকার পাশে নেই অনেক নেতাকর্মী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুলিয়ারচর উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের একক সিদ্ধান্ত ও সমন্বয় হীনতার কারণে প্রতিটি ইউনিয়নে এই ভয়াবহ চিত্র। তারা বলেন, গত ৫ বছরে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটির মধ্যে কোনো একটি সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। কোনো নির্বাচন বা কোন উপলক্ষেও কখনো কোনো মতামত নেওয়া হয় না বা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় না। এবারের ইউপি নির্বাচনেও প্রার্থীতার বিষয়ে কমিটির কারও কাছে কোনো রকম পরামর্শ না নিয়ে প্রার্থীতা দেওয়া হয়েছে। ভোট গ্রহণের সময় খুব নিকটে চলে আসলেও, এখন পর্যন্ত কীভাবে নেতা কর্মীরা নির্বাচন করবে তারও কোনো পরামর্শ করা হয়নি বা কাউকে কিছু বলা হয়নি বলে জানান তারা। তারা বলেন, দলের এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহ সবকিছুতে এমন সমন্বয় হীনতা থাকলে এমন বিরোধ স্বাভাবিক। এর জন্য নেতাকর্মীদের দোষারোপ করতে নারাজ জ্যেষ্ঠ নেতারা।
এইসব বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মুর্শিদ উদ্দিন সাংবাদিকদের সামনে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, আমি প্রায় ৩৫ বছর ধরে টানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে আছি। নির্বাচন ঘিরে আমাকেও বিন্দুমাত্র মূল্যায়ন করা হয়নি। কার কার নাম কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে, এই লিস্ট পর্যন্ত আমাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। আমার অসুস্থতা ও বার্ধক্য জনিত সমস্যার সুযোগে তালিকার পেপারের নামের অংশ হাতদিয়ে ঢেকে অনেকটা ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমার সাইন নেয় সাংগঠনিক সম্পাদক জহির রায়হান জজ । দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তালিকাটা দেখার মত এইটুকু অধিকার কি আমার নেই?
তিনি প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, জনগণ যেনো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের পরিবেশ পায় এবং জনগণ যেনো পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। কোনো রকম দলীয় প্রভাব বিস্তার ও কারচুপির মাধ্যমে কেউ যেন নির্বাচিত না হতে পারে, এমন একটি পরিবেশ উপহার চান তিনি।
এলাকায় না থাকায় এই বিষয়ে কুলিয়ারচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইমতিয়াজ বিন মুসা জিসানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নৌকাতো একাধিক প্রার্থীর হাতে দেয়া যাবে না। পছন্দের প্রার্থী মনোনয়ন না পাওয়ায় অনেকে মনঃক্ষুণ্ন আছে। আমাদের এমপি নাজমুল হাসান পাপন বর্তমানে দেশের বাহিরে আছেন। তিনি দেশে ফিরলে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলে সমাধান করা হবে। তাছাড়া আমি সকলের সাথে কথা বলছি, আশা করি নির্বাচনের আগে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তারপরও যদি কেউ নিদর্শনা না মানে, নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
