নিউজ ডেস্ক:
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কারের বিরোধিতা এবং হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা– বিরোধী দলগুলোর এমন ধারাবাহিক সমালোচনার মুখে এবার সরাসরি মাঠে নামছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দলটি মনে করছে, বিরোধীদের ‘পরিকল্পিত প্রচারণার’ কারণে সরকারের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় জনসংযোগ বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা এবং পাল্টা রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার কৌশল নিয়েছে দলটি।
এ লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোকে মাসব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণের নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ ইস্যুতে বিএনপিকে ‘সংস্কারবিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরার যে প্রচারণা চলছে, তার জবাব দিতে লিফলেটও পাঠানো হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাসব্যাপী কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিতে সারাদেশে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে— সব জেলা-মহানগর এবং দলের স্বীকৃত অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে কর্মসূচি দেওয়ার জন্য আপনাদের নির্দেশ দেওয়া হলো। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে।
কার্যালয়ের একটি সূত্র বলছে, আগামী এক মাস দেশজুড়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। এর মধ্যে থাকবে উঠান বৈঠক, পথসভা, লিফলেট বিতরণ, মতবিনিময় সভা, মিছিল এবং সরাসরি গণসংযোগ। জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন— সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এ কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব জেলা-মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হবে না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
জুলাই সনদ ও হাম পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদের ধারাবাহিক সমালোচনার মুখে বিএনপি মাসব্যাপী সরাসরি গণসংযোগ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সারাদেশের তৃণমূল নেতাকর্মীদের উঠান বৈঠক, পথসভা ও মিছিলের মতো সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দলটির লক্ষ্য হলো জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে বিরোধীদের ‘পরিকল্পিত প্রচারণার’ জবাব দেওয়া এবং নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা
বিএনপি সূত্রে আরও জানা গেছে, মাসব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে বিরোধীদের প্রচারণার জবাব দিতে সারাদেশে একটি লিফলেট পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে— গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে ‘খ’ নম্বর প্রশ্নটি জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং তা ‘প্রতারণামূলক’। একই সঙ্গে লিফলেটে উল্লেখ রয়েছে— বিএনপি জুলাই সনদ অনুযায়ী ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত সনদ বিএনপি ‘অক্ষরে অক্ষরে’ মানতে বদ্ধপরিকর। এছাড়া, লিফলেটে সংসদে নারী প্রতিনিধি বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকারসহ যেসব বিষয় ইতোমধ্যে বিরোধী দল লঙ্ঘন করেছে তাও তুলে ধরেছে বিএনপি। পাশাপাশি জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উল্লিখিত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী যে সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে— সেই কথা বলা আছে, তাও তুলে ধরা হয়েছে।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমরা জুলাই সনদের চেতনা ধারণ করি কি না, সেটি দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বারবার তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। আমরা সব সনদই ধারণ করি। আমরা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করি, ’৯০-এর গণ-আন্দোলনের চেতনা ধারণ করি এবং ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাও ধারণ করি। বরং যারা এ প্রশ্ন তুলছেন, তারা নিজেরা ’৭১-এর চেতনা ধারণ করেন কি না, একবার তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন।
বিএনপির নেতারা বলছেন, সম্প্রতি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সমালোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে ‘সংস্কারবিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে চাপে রাখতে পরিকল্পিত এসব প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জুলাই সনদ নিয়ে বিভিন্ন দলের ভিন্নমত রয়েছে। সেখানেও বলা আছে— যে দল নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে, তারা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করবে।
দলটির নেতারা আরও বলছেন, হাম পরিস্থিতিকেও রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করছে বিরোধী দলগুলো। অথচ আগের সরকারের সময় টিকাদান কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, যার প্রভাব এখন দৃশ্যমান। অন্যদিকে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।
‘সংস্কারবিরোধী’ প্রচারণার বিপরীতে বিএনপি একটি পাল্টা রাজনৈতিক বয়ান তৈরির কৌশল নিয়েছে। এ জন্য তৃণমূল পর্যায়ে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। লিফলেটে বিএনপি জুলাই সনদ অনুযায়ী উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা ও স্বাক্ষরিত সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ মেনে চলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে বিরোধী দলের দ্বারা সনদের বিধান লঙ্ঘনের বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে।
গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে নেতাকর্মীদের সরাসরি জনগণের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি নেতাকর্মীদের সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সহযোগিতা চান এবং সরকারের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ব্যাখ্যা জনগণের সামনে তুলে ধরতে এবং ‘ভুল তথ্যের’ জবাব দিতে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির নিজস্ব কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি সরকারে থাকার কারণে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারগুলো পালন করতে থাকব।’
বিরোধী দলের কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কর্মসূচি পালন করা স্বীকৃত রাজনৈতিক অধিকার। দাবি আদায়ে মিছিল, সমাবেশ কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতেই পারে বিরোধী দল। এখানে ‘মোকাবিলা’ করার কোনো বিষয় নেই। তবে, কোনো কর্মসূচি যদি ধ্বংসাত্মক কিংবা জননিরাপত্তা ও জনজীবনের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”
রিজভী বলেন, নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। বিএনপি সরকারও এ ধরনের কর্মসূচিতে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। যে গণতন্ত্রের জন্য আমরা গত ১৬-১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, সেই আন্দোলনের মূল চেতনার সঙ্গেই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া পরিপন্থী। বিরোধী দল তাদের দাবি উত্থাপন করবে, সমাবেশ করবে, সংসদে কথা বলবে— এগুলো তাদের সাংবিধানিক অধিকার।
জুলাই সনদের চেতনা বিএনপি ধারণ করে না— এমন প্রচারণা সম্পর্কে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, ‘আমরা জুলাই সনদের চেতনা ধারণ করি কি না, সেটি দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বারবার তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। আমরা সব সনদই ধারণ করি। আমরা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করি, ’৯০-এর গণ-আন্দোলনের চেতনা ধারণ করি এবং ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাও ধারণ করি। বরং যারা এ প্রশ্ন তুলছেন, তারা নিজেরা ’৭১-এর চেতনা ধারণ করেন কি না, একবার তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন।’
