জাতীয় ডেস্ক :
দেশের বৃহত্তর চিনি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চুয়াডাঙ্গার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড। দেশের মধ্যে ভারী এই শিল্প প্রতিষ্ঠান চিনি উৎপাদনসহ বেশ কয়েকটি বিভাগে মিলটি প্রতি বছর লোকসানের মুখে পড়ে। চিনিকল ও খামারে লোকসান গুনতে হয়েছে ৭৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। আর সরকারকে ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়েছে।
এ অর্থ বছরে লোকসান পুষিয়ে ও রাজস্ব দিয়ে ডিস্টিলারি, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ভিনেগার ও জৈব সার কারখানা থেকে ২৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন হয়েছে।
১৯৩৮ সালে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সমস্যা আর সম্ভাবনার মধ্যে দিয়ে মিলের কার্যক্রম চলছে। বিগত ৮৩ বছরে মিল থেকে দুই অর্থবছরে লাভের মুখ দেখল বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি।
২০২০-২০২১ অর্থ বছরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ৫টি বিভাগের মধ্যে চিনি কল, ৯টি খামার ও পরীক্ষামূলক চালু হওয়া খামারে লোকসান গুনতে হয় ৭৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। আর ডিস্টিলারি, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও জৈব সার কারখানা থেকে মুনাফা অর্জন হয়েছে। ডিস্টিলারি থেকে মোট আয় হয় ১৭৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সরকারকে ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়েও লাভ হয় ১০৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ডিস্টিলারির টাকা দিয়ে খামারের লোকসান পুষিয়ে নিতে হয়।
জৈব সার কারখানায় ২৫ লাখ টাকা, হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ও ভিনেগার উৎপাদন করে ৩২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আয় হয়েছে। খামারের লোকসান ও সরকারের রাজস্ব দিয়েও মিলটির মুনাফা অর্জন হয়েছে ২৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা প্রায়।
সরকারিভাবে এ অর্থ বছরে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ২৫ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাড়ে ৩ কোটি টাকা বেশি আয় হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মিলটি প্রথম বাবের মত লাভের মুখ দেখে। আয় করে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
২০২০-২০২১ অর্থবছরে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড এ আখ মাড়াই কার্যক্রম শুরু হয়। কোনরকম যান্ত্রিক সমস্যা ছাড়াই ২০২১ সালের ২১ মার্চ মৌসুমের মাড়াই কার্যক্রম শেষ হয়। এবার আখ মাড়াই করা হয় ১ লাখ ১১ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন। আখ মাড়াই করার পর মিল থেকে চিনি উৎপাদন হয়েছে ৫৮৮৩ মেট্রিক টন।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ১ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৯ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করবে।
২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে মিলটিতে চিনি অবিক্রিত ছিল ৪ হাজার ৬৮২ মেট্রিক টন। দুই অর্থ বছরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে অবিক্রিত চিনির মজুদ দাড়ায় ৪ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। প্রতি কেজি চিনি ৬৬ টাকা দরে বিক্রি হয়। অবিক্রিত চিনির বাজার মূল্য ২৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
ডিস্টিলারি বিভাগ ৫২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৩ প্রুফলিটার দেশি ও বিদেশি মদ উৎপাদন করেছে। বাজারজাত করা হয়েছে ৪৬ লাখ ৯৬ হাজার প্রুফলিটার। কান্ট্রি ইস্পিরিট ২৮ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৫ প্রুফলিটার, ফরেন লিকার ১০ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯৬ প্রুফলিটার, রেক্টিফাইট ইস্পিরিট ৮৮ হাজার ১০৮ লিটার, ডিনেচার ইস্পিরিট ৬ লাখ ৯১ হাজার প্রুফলিটার ও অ্যালকোহল ২ হাজার ৪৮২ প্রুফলিটার উৎপাদন হয়।
রেকর্ড পরিমাণ ১ লাখ ১৬১ হাজার কেস বোতলজাত বিদেশি মদ বিক্রি হয়েছে। বিভিন্ন ব্যান্ডের উন্নত মানের বিদেশি মদের চাহিদা রয়েছে ক্রেতাদের কাছে। কেরুর ইতিহাসে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ বিদেশি মদ বাজারে বিক্রি হয়েছে।
করোনাকালীন সময়ে চাহিদা বেড়ে যায় হ্যান্ড স্যানিটাইজারের। কেরুর উৎপাদিত হ্যান্ড স্যানিটাইজারের গুণগত মান ও কার্যকারিতা ভাল। এ অর্থবছরে প্রায় ২১ হাজার লিটার হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন করে বাজারজাত করা হয়। ১ কোটি ৫ লাখ টাকার হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি হয়েছে।
ডিস্টিলারি বিভাগে রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হওয়ার কারণে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড মুনাফা অর্জন করে। মিলটির প্রধান চালিকা শক্তি ডিস্টিলারি বিভাগ। ডিস্টিলারি বিভাগের আধুনিকায়ন করা সম্ভব হলে রাজস্ব কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক কৃষি ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, কেরু অ্যান্ড কোম্পানি দুই অর্থবছরে লাভের মুখ দেখেছে। মিলটি আধুনিকায়ন করা সম্ভব হলে বেশি মুনাফা অর্জন সম্ভব। মিলের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছে। সম্পূর্ণ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
