হোম জাতীয় সাগরে মাছ শিকারে নিরাপত্তা নেই জেলেদের

জাতীয় ডেস্ক :

যুগ যুগ আগের ট্রলার দিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবেই চলছে সাগরে মাছ শিকার। ট্রলারগুলোতে জিপিএস পদ্ধতি না থাকায় আবহাওয়ার তথ্য সাগরে জানতে পারেন না জেলেরা। এমনকি নেই জীবন রক্ষার সামগ্রীও। চলতি বছরের ৮ মাসে ট্রলার ডুবির ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন। নিখোঁজ হন অর্ধশতাধিক জেলে।

গত ৭ বছরে বঙ্গোপসাগরে ডুবেছে ৬০৯টি মাছ ধরার ট্রলার। এসব ট্রলার ডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৭২ জন জেলের কোনো সন্ধান পায়নি মৎস্য অধিদফতর। এছাড়া গত ৭ বছরে আহত হয়েছে ১ হাজার ১০৬ জেলে এবং মৃত্যুবরণ করেছে ২৫৯ জন।

সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সময় সংবাদকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদফতরের উপ-পরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার।

জীবিকার টানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রতিবছর নিখোঁজ হচ্ছে একের পর এক জেলে। বেশিরভাগ পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হারিয়ে পাগল প্রায়। আর জেলে পরিবারগুলোর জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে সময় সংবাদকে জানান, অধিকাংশ ট্রলার মালিকরা জেলেদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। এছাড়া ট্রলারগুলোতে জীবন রক্ষার ন্যূনতম কোনো সামগ্রী দেয় না। ফলে দুর্ঘটনার কবলে পড়লে বেঁচে ফেরার সংখ্যা দিন দিন কমছে। ট্রলার মালিকরা যদি আধুনিক যন্ত্রপাতি ও জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী দিত তাহলে জেলেদের নিখোঁজ আর মৃত্যুর সংখ্যা কমে যেত।

জেলেদের অভিযোগ সত্য বলে মহিপুর বন্দর মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাজু আহম্মেদ রাজা বলেন, জেলেরা সাগরে না গেলে আমরা প্রায় অচল। মাছের এই ব্যবসা পুরোটা টিকে আছে জেলেদের ওপর। সাগরে যাওয়া ট্রলারগুলোতে জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। তবে ট্রলার মালিকরা জেলেদের এসব দেয়ার চেষ্টা করছে। সরকারি সহায়তা পেলে জেলেদের জন্য জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী ও ট্রলারগুলো আরও উন্নত করা যাবে বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে বিভাগীয় মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, শুধু চলতি বছর গত ৯ মাসে ১৫১টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় জেলে নিখোঁজ হয়েছে ৪৭ জন। আহত হয়েছে ১৮২ জেলে আর মৃত্যুবরণ করেছে ১৮ জন।

২০২১ সালে ৮২টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় জেল নিখোঁজ হয়েছেন ১১ জন। আহত হয়েছেন ১২৩ জেলে আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৯ জন।

২০২০ সালে ১০৭টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় জেলে নিখোঁজ হয়েছেন ১৩ জন। আহত হয়েছেন ১৩৫ জেলে আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৫৭ জন।
২০১৯ সালে ৮২টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় জেলে নিখোঁজ হয়েছেন ২২ জন। আহত হয়েছেন ১৬৪ জেলে আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৮ জন।
২০১৮ সালে ৫৬টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় জেলে নিখোঁজ হয়েছেন ৬২ জন। আহত হয়েছেন ১৭৯ জেলে আর মৃত্যুবরণ করেছেন ১৮ জন।
২০১৭ সালে ৪৬টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় জেলে নিখোঁজ হয়েছেন ৭ জন। আহত হয়েছেন ১৫১ জেলে আর মৃত্যুবরণ করেছেন ১২ জন।
২০১৬ সালে ৮৫টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় জেলে নিখোঁজ হয়েছেন ১০ জন। আহত হয়েছে ১৭২ জেলে আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৭৭ জন।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিভাগীয় মৎস্য অধিদফতরের উপপরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার বলেন, দুর্ঘটনায় জেলেদের নিখোঁজের মূল কারণ তাদের অসচেতনতা। লাইফ জ্যাকেট, বয়া এসব না নিয়েই সাগরে মাছ ধরতে যায় তারা। আমরা বিভিন্নভাবে জেনেছি মাছ ধরার ট্রলারগুলোর মালিকরা জেলেদের নিরাপত্তার সরঞ্জাম সরবরাহ করে না। ট্রলার মালিকদের ধারণা ট্রলারগুলো যদি সাগরে বিপদের সম্মুখীন হয় তাহলে লাইফ জ্যাকেট অথবা বয়া নিয়ে জেলেরা নিজেদের বাঁচাতে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ট্রলার বাঁচানোর চেষ্টা করবে না।

তিনি আরও বলেন, বরিশাল অঞ্চলের অধিকাংশ ট্রলারগুলো আদিম যুগের। এসব ট্রলারে জিপিআরএস, জিএসএমসহ আধুনিক কোন সরঞ্জাম নেই। ফলে জেলেরা বিপদে পড়লে কোনভাবে সাহায্য চাইতে পারে না। আর বিপদের কথা মাঝ সমুদ্রে বসে জানতেও পারে না। ফলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় তাদের জান মালের ক্ষতি হয়।

এসব বিপদ থেকে কিভাবে মুক্তি পাবে জেলেরা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের একটি প্রজেক্ট এরইমধ্যে বরিশাল বিভাগে চলমান আছে। এর মাধ্যমে জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে। এছাড়া প্রায় ৪ হাজার ১০০টি জিএসএম বিতরণসহ লাইফ জ্যাকেট, বয়া বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জিএসএম মেশিনগুলো বিতরণ হলে জেলেদের জন্য অনেক সুযোগ সৃষ্টি হবে। জিএসএমের মাধ্যমে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূর থেকে জেলেরা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও প্রদান করতে পারবে। ফলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় তাদের জান ও মালের ক্ষতি অনেকটা কমে যাবে।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন