হোম অর্থ ও বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে চলতি বছর ১৩২৭ কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে সরকার

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে চলতি বছর ১৩২৭ কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে সরকার

কর্তৃক Editor
০ মন্তব্য 45 ভিউজ

নিউজ ডেস্ক:
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির কারণে চলতি অর্থবছরেই সরকার প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা শুল্ক রাজস্ব হারাতে পারে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি মনে করছে, এই চুক্তির ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য অন্যান্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দিতে হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট সুপারিশ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে **রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট** স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। পাশাপাশি আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে।

তার মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে চলতি অর্থবছরেই সরকার আমদানি শুল্ক থেকে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে। তিনি আরও বলেন, চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা ডব্লিউটিও-এর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দিতে বাধ্য হতে পারে বাংলাদেশ।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এ কারণে চুক্তির প্রভাব—বিশেষ করে রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের বিষয়টি—পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার আলোচনা করা উচিত।

বৈঠকে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে বিশ্বে বাণিজ্যকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা ডব্লিউটিও ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই চুক্তির বিস্তারিত বিষয়গুলো জনসম্মুখে আনা উচিত, কারণ এতে অনেক আর্থিক ও নীতিগত ঝুঁকি থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে হবে। কিন্তু বেসরকারি খাতকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি করতে উৎসাহিত করতে হলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। তা না হলে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি করবে—এ প্রশ্নও রয়েছে। এছাড়া তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক, কোথা থেকে পণ্য কেনা যাবে বা যাবে না—এসব বিষয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে রাজস্ব আদায়কে আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২.৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রায় ৫৯.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বাস্তবে অর্জন করা কঠিন। ইতোমধ্যে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি করছে এবং এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, কারণ বাংলাদেশের বড় অংশের জ্বালানি ওই অঞ্চল থেকেই আসে।

উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩.২ শতাংশ কমেছে, অথচ আমদানি বেড়েছে ৩.৯ শতাংশ।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ থেকে সরে আসতে হবে। বর্তমানে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে তা এখন মাত্র ৬.৮ শতাংশ। এই লক্ষ্য অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর রাজস্ব সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন