হোম খুলনাযশোর যশোর-৫ মনিরামপুর-৮৯ আসনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা: কে হবেন জয়ী?

যশোর-৫ মনিরামপুর-৮৯ আসনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা: কে হবেন জয়ী?

কর্তৃক Editor
০ মন্তব্য 126 ভিউজ

রিপন হোসেন সাজু:

গতকাল শনিবার দুপুর ২টা ১০ মিনিট। যশোর মনিরামপুর উপজেলা পরিষদের সামনে একটি চায়ের দোকান। দোকানে বসে আছেন জন দশেক লোক। তাঁদের মধ্যে চারজন চা পান করছেন। পাশে বসে কথা বলেছিলেন আরও ছয় জন। তাঁরা চা পান শেষ করেছেন। তাঁরা কথা বলছেন ভোট নিয়ে। একজন বললেন, যতো দিন যাচ্ছে কলস মার্কার অবস্থা ভালো হচ্ছে। আরেক জন বললেন, কলস এবং ধানের শীষের টানাটানিতে দাঁড়িপাল্লা বেরিয়ে যেতে পারে। পাশে বসা একজন সামনের টুলের ওপর রাখা মুঠোফোন তুলে নিলেন। একজনকে কল করে জানতে চাইলেন, আওয়ামী লীগের ওই নেতা কার পক্ষে কাজ করছেন?
সামনে বসা ধোঁয়া তোলা চায়ের গরম কাপে চুমুক দিতে দিতে উপজেলার বিজয়রামপুর গ্রামের আসবাবপত্রে রং করা শ্রমিক নওশের আলী (৫৮) বললেন, মনিরামপুরে ধানের শীষ জিতবে। তবে কলস এবং ধানের শীষ ভোটকাটাকাটি করতে পারে। সেক্ষেত্রে দাঁড়িপাল্লা এগিয়ে যেতে পারে। চায়ের দেকানের সামনে ভ্যানের ওপর বসেছিলেন উপজেলার ফেদাইপুর গ্রামের ডিমবিক্রেতা হোসেন আলী (৫০)। তিনি বলেন, ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রশীদ আহমাদ নতুন মুখ। তাঁর বাবা মুফতি ওয়াক্কাসকে সবাই চিনতেন। কিন্তু রশীদ আহমাদকে মানুষ খুব একটা চেনেন না। ভোটের লড়াই হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেন ও জামায়াতের গাজী এনামুল হকের মধ্যে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির ভোট কাটতে পারে। জামায়াত সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
প্রচার-প্রচারণায় মুখর যশোর-৫ আসন। চলছে মাইকিং। মোড়ে টানানো হয়েছে প্রার্থীদের ব্যানার। পথসভা, এলাকায় এলাকায় যেয়ে প্রার্থীদের কমী-সমর্থকদের চলছে ভোট প্রার্থনা। সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও চলছে ভোটের আলোচনা। চলছে বিশ্লেষণ। কোন প্রার্থীর কোথায় কী অবস্থান, হিন্দুদের ভোট কে পাবে, কে জিততে পারেন-এসব নিয়ে আলোচনা সর্বত্র।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলা নিয়ে যশোর-৫ আসন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রশীদ আহমাদ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গাজী এনামুল হক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে। হাতপাখা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মো. জয়নাল আবেদীন। জাতীয় পার্টি এম এ হালিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন লাঙ্গল প্রতীকে। স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেন কলস প্রতীক নিয়ে এবং মো: কামরুজ্জামান ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
শহীদ মো: ইকবাল হোসেন মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসন থেকে বিএনপি তাঁকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়। পরে তা পরিবর্তন করে বিএনপির শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রশীদ আহমদকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামেন শহীদ মো: ইকবাল হোসেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয় শহীদ মো. ইকবাল হোসেনকে। শহীদ মো. ইকবাল হোসেন ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। দুইবারই তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রয়াত খান টিপু সুলতানের কাছে হেরে যান। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে দল তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে পরে তা পরিবর্তন করে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি ওয়াক্কাসকে দেয়।
হরিদাসকাটি ইউনিয়নের মোট ভোটারের অর্ধেকের বেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের। পাঁচকাটিয়া, পাঁচবাড়িয়া, নেবুগাতী, কুচলিয়া, কুমারসীমা, ভুলবাড়িয়া, দিগঙ্গা গ্রামের জনসংখ্যার সবাই হিন্দু এবং ইউনিয়নের অবশিষ্ট ১২ টি গ্রামের জনসংখ্যার অধিকাংশই হিন্দু বলে জানান নেবুগাতী গ্রামের মিলন মন্ডল (৩৩)। তিনি বলেন, ভোটের পরিবেশ ভালো। সবাই প্রচারণা করছেন। মাইকিং চলছে। লিফলেট নিয়ে গ্রামে গ্রামে আসছেন নেতাকর্মীরা। তবে ভোটের যে উত্তাপ-সেটা দেখা যাচ্ছে না। শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটা। তিনটি গ্রামের অন্তত সাত জন নারী ও পাঁচজন পুরুষ ভোটারের সঙ্গে কথা হয় উপজেলার হাজিরহাট বাজারে। হিন্দু ভোটারদের ভাষ্য, যারা তাঁদের পাশে থাকবে, তাঁদের নিরাপত্তা দেবে, তাঁরা তাঁদের ভোট দেবেন। তাঁরা যেন নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার না হন, প্রার্থী ও তাঁর দলের কাছে সেই নিশ্চয়তা ও প্রতিশ্রুতি চান। তা না হলে, এলাকার ভোটাররা বিশেষ করে নারী ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন না। প্রচারে ভালো সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে শহীদ মো: ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ আমি জয়লাভ করবো। মনিরামপুরে ৭০ হাজারেরও বেশি হিন্দু ভোটার আছে। তাঁদের বেশিরভাগ আমাকে ভোট দেবেন। কিন্তু আমাদের কাছে দুই-একটি খবর আছে, কে বা কারা হিন্দু এলাকায় যেয়ে হিন্দুদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করছে। যদি তাঁরা যায়, তবে বিশেষ একটি প্রতীকে ভোট দিতে বলছে। বিষয়টি আমরা নির্বাচন কমিশনে জানিয়েছি।’ রশিদ আহমাদ বলেন, ‘ভোটারদের অনেক সাড়া পাচ্ছি। আমার পিতা এই আসন থেকে তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি অত্যন্ত সততার সঙ্গে চলেছেন। আব্বার বব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে ভোটারদের অনেক বেশি সাড়া পাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ অবশ্যই জয়লাভ করবো।’ অনেক চেষ্টা করেও গাজী এনামুল হকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ২১৫ জন, মহিলা ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৩ জন এবং হিজড়া ভোটার ৪ জন।

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন