অনলাইন ডেস্ক :
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন তাদের জাতীয় নির্বাচনের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তাদের ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন একটা নতুন ইতিহাস গড়েছে ব্যাপক উত্তেজনা ও অপ্রত্যাশিত ফলাফলের মধ্য দিয়ে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পণ্ডিত ও বিশ্লেষকরা বলছিলেন, এতে ডেমোক্র্যাটদের ভরাডুবি নিশ্চিত। কিন্তু না! নির্বাচনের ফলাফল তাদেরকে বেশ অবাক করেছে। এটা কীভাবে হলো এবং কোন রাজনৈতিক শক্তি এতে কাজ করেছে?
মধ্যর্বতী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সাধারণত একটি ভালো ধোলাই খেয়ে থাকে বিভিন্ন নীতিগত কারণে। ক্ষমতায় থাকলে জনপ্রিয়তা কমে যায়—ডেমোক্র্যাটরা এই ঐতিহাসিক ধারাকে ভুল প্রমাণ করেছেন। তবে অত সহজে নয়; হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মাধ্যমে। সিএনএন-এর জরিপ অনুযায়ী, তরুণ ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের বাঁচিয়ে দিয়েছে; নাহয় তাদের পরাজয় ছিল অবশ্যম্ভাবী। তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি এবার সবাই বেশ ভালোই অনুভব করছে। আসলে তরুণদের পছন্দ জো বাইডনে নয়; তাদের পছন্দ তাদের দল—ডেমোক্রেটিক পার্টি।
প্রায় দুবছর আগে মার্কিন গণতন্ত্র একটা বিশাল ধাক্কা খেয়েছিল তখনকার নির্বাচন নিয়ে অসুস্থ বিতর্কের কারণে। ট্রাম্প গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিলেন ওই নির্বাচনের ফল অস্বীকার করে। এরপর সবাই আশা করেছিলেন, মার্কিন জনগণ আবার ঘুরে দাঁড়াবে তাদের উদার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে। কিন্তু তাদের মধ্যবর্তী নির্বাচন এমন একটা ফলাফল উপহার দিল, যা জাতীয় বিভাজনের একটি নিখুঁত উদাহরণ হয়ে থাকবে বহুকাল। আমেরিকান নেতারা যে একত্রিত হতে পারেন—এমন কোনো লক্ষণ এতে নেই।
এই নির্বাচনী মৌসুমে আমেরিকান ভোটাররা তাদের লেন্স দিয়ে একটি বড় ইস্যুতে নজর দিয়েছেন, সেটা হচ্ছে তাদের অর্থনীতি। আমেরিকানরা মুদ্রাস্ফীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এরপর বেকারত্ব, চাকরি ও অপরাধ।
মাত্র ১৮ মাসে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উচ্চাভিলাষী এজেন্ডা ধ্বংস হয়ে গেল! তলানিতে চলে এলো তার জনপ্রিয়তা! ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজিত করে এবং কংগ্রেসের উভয়কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা অনেকটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। সারা বিশ্বের নজর ছিল তখন জো বাইডেনের ওপর। আসলে কোথায় ভুল করেছেন জো বাইডেন? অনেকেই মনে করেন, দেড় বছর না হতেই ডেমোক্র্যাটরা তাদের দলীয় রাজনীতিকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্য, অযোগ্য নেতৃত্ব, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং তাদের রাজনৈতিক কাঠামো পুরো দেশকে চরম অস্থিরতার মুখে ঠেলে দেয়।
বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিকের ধারণা—প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নাজুক নেতৃত্ব, বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে কৌশলগত দুর্বলতা বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে নুইয়ে দিয়েছে। এরইমধ্যে আফগানিস্তানের নেতৃত্ব চলে যায় তালেবানের হাতে। চীন, তাইওয়ান, হংকং ও উইঘুরদের বিরুদ্ধে তাদের আগ্রাসন বাড়িয়ে দেয়। আর এখন রাশিয়া আক্রমণ চালাচ্ছে প্রতিবেশী ইউক্রেনে।
আমেরিকানরা আরও মনে করেন, বাইডেন প্রশাসন নেতৃত্ব দেয়ার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়া দেখাতে বেশি ব্যস্ত থাকে। ইউক্রেনের ওপর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হামলা বন্ধ করতে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন ছিল। শুধু নিষেধাজ্ঞা ইউক্রেন এবং অন্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে আক্রমণ বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট নয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির চাপে রয়েছেন।
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য মোতাবেক, গেল এক বছরের মধ্যে আগস্টে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ১.৬ শতাংশে সঙ্কুচিত হয়ে গত তিন মাসে তা ০.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, জিডিপিতে পরপর দুই ত্রৈমাসিকে প্রবৃদ্ধির ব্যাপক পতন হলে মন্দা শুরু হয়। কিন্তু বাইডেন প্রশাসন যুক্তি দিয়েই যাচ্ছে বেকারত্ব—যা কিনা অর্থনীতির স্থিতিস্থাপক—পাঁচ দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক আর্থিক সংস্থা ব্যাঙ্করেটের একটি জরিপ অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১০ জনের মধ্যে সাতজন বলছেন যে, তারা মন্দা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন এবং ১০ জনের মধ্যে চারজন বলেছেন যে, তারা ২০২৩ সালের শেষের ধাক্কা সামলানোর জন্য আর্থিকভাবে আদৌ প্রস্তুত নন।
গত ৭ নভেম্বর রয়টার্স এবং ইপসোস পোলে দেখা যায় যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জনপ্রিয়তার রেটিং ৩৯ শতাংশে নেমে এসেছে। দুদিনের এই জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, বাইডেনের কাজে আমেরিকানদের সমর্থন এক পয়েন্ট কমেছে, যা তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে সর্বনিম্নের কাছাকাছি।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কী?
মধ্যবর্তী নির্বাচন হয় মূলত কংগ্রেসের জন্য। কংগ্রেসের দুটো কক্ষ রয়েছে—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। এই নির্বাচন প্রতি দুবছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু এটি রাষ্ট্রপতির চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে হয়; তাই এটাকে ‘মধ্যবর্তী মেয়াদ’ বলা হয়।
প্রতিটি রাজ্যে দুজন সিনেটর থাকেন, যারা ছয় বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হন। প্রতিনিধিরা দুই বছরের জন্য কাজ করেন এবং ছোট অঞ্চলগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন সিনেটের এক-তৃতীয়াংশের পাশাপাশি নভেম্বরে নির্বাচনের জন্য রয়েছে। বেশ কয়েকটি বড় রাজ্যে তাদের গভর্নর এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের জন্য নির্বাচন রয়েছে।
কংগ্রেস সারা দেশের জন্য আইন তৈরি করে। প্রতিনিধি পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয় কোন আইনগুলো ভোটে দেয়া হবে। ভোটে পাস হলে তা পাঠানো হয় সিনেটে। আর সিনেট হয় তা অনুমোদন দেয় অথবা বাতিল করে দেয়। এ ছাড়াও সিনেট রাষ্ট্রপতির নিয়োগগুলোকে নিশ্চিত করতে পারে এবং খুব কমই তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত পরিচালনা করতে পারে।
বুড়ো বাইডেন
আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তার বয়সে এখন ৭৯। ডেমোক্র্যাটরা এখন তার বয়স নিয়েও উদ্বিগ্ন।
হার্ভার্ড-হ্যারিস-এর জরিপে বাইডেন ডেমোক্র্যাটদের মাত্র ৩০ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। নিবন্ধিত ভোটারদের ৭১ শতাংশ বলেছেন যে, বাইডেনের আর নির্বাচন করা উচিত হবে না। ‘কেন’ জিজ্ঞাসা করা হলে, ৪৫ শতাংশ বলেছেন—‘তিনি একজন খারাপ রাষ্ট্রপতি’। অন্য ৩০ শতাংশ বলেছেন—‘তার বয়স অনেক বেশি’। আবার ষাট শতাংশ বলেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও নির্বাচনে যাওয়া উচিত নয়। জনসাধারণের ভয় এই যে, একজন বৃদ্ধ বাইডেনের পক্ষে বড় কোনো সংকটে সাড়া দেয়া সম্ভব নয়। কাজেই তার পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেয়া অনুচিত।
নির্বাচন ২০২৪
মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল ২০২৪ সালের মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চর্চা। বেশ কয়েকজন প্রার্থী এরইমধ্যে অপেক্ষা করছেন প্রার্থিতা ঘোষণা করার জন্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে দলের মনোনয়ন পাওয়ার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছেন। যদি তা-ই হয়; তাহলে সেই ২০২০ সালের মতোই পুনরায় জো বাইডেনের মুখোমুখি হবেন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে ট্রাম্পকে ছাড়িয়ে যেতে কঠোর পরিশ্রম করছেন ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস। তার জনপ্রিয়তা বেশ ভালো।
ট্রাম্পের হাঁকডাক
এরই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি তার মার-এ-লাগো রিসোর্ট থেকে নভেম্বরে একটি বড় ঘোষণা দেবেন। আসলে তিনি ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
‘আমি মঙ্গলবার, ১৫ নভেম্বর, ফ্লোরিডার পাম বিচে মার-এ-লাগোতে একটি খুব বড় ঘোষণা করতে যাচ্ছি।’ ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে ওহাইওর ভান্ডালিয়াতে একটি সেভ আমেরিকা সমাবেশে এ কথা বলেছিলেন। ট্রাম্প ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতির দৌড় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার কাছাকাছি আসার সাথে সাথে জরিপগুলো দেখায় যে, তিনি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে অতুলনীয় সমর্থন উপভোগ করেন।
রিপাবলিকানরা এখনও সংকীর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি অনেক পার্থক্য হবে? গত দুই বছরে ডেমোক্র্যাটদের দ্বিকক্ষ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনকে আপস করতে হয়েছে তার পরিকল্পনা পাস করানোর জন্য। সিনেটে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা হবে; তা এখনও অস্পষ্ট। সম্ভবত এটি আবারও জর্জিয়ার ওপর নির্ভর করবে। মীমাংসা হবে আসন্ন রান-অফ নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়ে।
প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার পল রায়ান ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির হোয়াইট হাউসের মনোনীত প্রার্থী হবেন না। কারণ ট্রাম্পের নির্বাচন করার অযোগ্যতা ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে যাবে। রায়ান পরামর্শক সংস্থা তেনিওর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন গত অক্টোবরে।
এরইমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রন ডিস্যান্টিসের (৪৪) মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক ও প্রতিযোগিতা ফুটে উঠেছে। এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডিস্যান্টিস গভর্নর হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ব্যাপক ভোটে এবং রিপাবলিকান পার্টির উজ্জ্বল উদীয়মান তারকা হিসেবে তার মর্যাদা স্থায়ী করেছেন। তিনি ২০২৪ সালে হোয়াইট হাউস মনোনয়নের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ব্যাপকভাবে আশা করা হচ্ছে দলের লোকজনের পক্ষ থেকে।
এমতাবস্থায় ডিস্যান্টিসকে কটাক্ষ করে ট্রাম্প বলেছেন, ‘গভর্নর ডিস্যান্টিসের মধ্যে আনুগত্যের বেশ অভাব রয়েছে’।
