হোম জাতীয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌ দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন

জাতীয় ডেস্ক :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার লইসকা বিলে দুই বাল্কহেডের সঙ্গে ইঞ্জিনচালিত যাত্রীবাহী নৌকার সংঘর্ষে ২৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় জেলা প্রশাসনের ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে।

এদিকে পাঁচ দিনের মাথায় দুর্ঘটনাকবলিত নৌকার মাঝি ও বেঁচে যাওয়া যাত্রীসহ এখন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৩০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে কমিটির সদস্যরা। তবে প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনাকবলিত নৌকার মাঝিকেই দুষছেন বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা। তদন্ত কমিটির কাছে এ সংক্রান্ত বিষয়ে একাধিক যাত্রী সাক্ষ্য দিয়েছেন।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রুহুল আমিনের (প্রদান) নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির অপর সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোজাম্মেল হোসেন রেজা ও ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম।

নৌ দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রী জামাল মিয়া সেই দিন সাংবাদিকদের জানান, তার বাড়ি হবিগঞ্জে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়ায় বসবাস করেন। ঘটনার দিন বিজয়নগর উপজেলার মুকুন্দপুর গ্রামে ব্যবসায়ীক কাজে গিয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় কাজ শেষে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চম্পকনগর ঘাট থেকে তিনি নৌকায় উঠেন।

তিনি জানান, তিনি নৌকার উপরের অংশে ছিলেন। দূর থেকে দুটি বড় আঁকারের নৌকা (বাল্কহেড) আসতে দেখে নৌকার মাঝিকে ডান পাশ দিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু মাঝি সেটি আমলে না নিয়ে তাদেরকে চুপ থাকার পরামর্শ দিয়ে বাম পাশ দিয়ে যায়। এসময় প্রথমে একটি বালুবাহী বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। পরে এর পেছনে থাকা অপর একটি বড় নৌকা (বাল্বহেড) এসে বালুবাহী নৌকার সঙ্গে ধাক্কা দেয়। তখন যাত্রীবাহী নৌকাটিতে যাত্রী ধারণের ঠাঁই ছিল না। ট্রলারের মাঝির ভুলের কারণেই এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

নৌ দুর্ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত কমিটির সদস্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল রেজা জানান, নৌ-দুর্ঘটনার আজ পঞ্চম দিন। দুর্ঘটনায় আমরা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। এখন পর্যন্ত বেঁচে যাওয়া যাত্রীসহ ৩০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছি। সব সাক্ষীর দেওয়া তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে নৌ দুর্ঘটনা প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা রোধ করার লক্ষ্যে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে বেশ কয়েক দফা সুপারিশ করা হবে। আগামী দশ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এখনই প্রকৃত কারণ বলা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। কেবল একটি কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। তবে নৌকার মাঝি অদক্ষ ছিল। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ছিল নৌকায়, সে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া গেছে। আরও একাধিক কারণ নির্ণয় করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

নৌ দুর্ঘটনা সম্পর্কে জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রুহুল আমিন জানান, আমরা একাধিক বিষয়ের ওপর তদন্ত করছি। বেঁচে যাওয়া যাত্রী ছাড়াও বিজয়নগরের চম্পকনগর ঘাট থেকে ছেড়ে আসা ঘাটের একাধিক সাক্ষীর সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। এর মধ্যে একজন মুড়িওয়ালার (নাম প্রকাশ করেনি তদন্তের স্বার্থে) আমাদেরকে জানিয়েছেন যাত্রীবাহী নৌকাটি ৪টা ৩০ মিনিটে চম্পকনগর ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও নৌকাটি ৪টা ৫০ মিনিটে চম্পকনগর ঘাট ছেড়ে যায়।

তিনি বলেন, এর মধ্যে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। এ সময় আলোর স্বল্পতা দেখা দেয়। পাশাপাশি নৌকাটির কোনো ফিটনেস ছিল না। লাইফ সাপোর্ট ছিল না। নৌকাটির চালকের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল। এসব কারণকে সামনে রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে। নৌ দুর্ঘটনার একাধিক কারণ পাওয়া গেছে। এই মুহূর্তে সঠিকভাবে কেবলমাত্র একটি কারণ চিহ্নিত করে দুর্ঘটনার জন্য কাউকে দায়ী করা যাচ্ছে না। একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সব বিষয়ে তদন্ত করে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে নৌ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার একক কারণ নাও থাকতে পারে।

তিনি জানান, ‘দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ করা হবে। এর মধ্যে চম্পকনগর এবং আনন্দবাজার ঘাটে চলাচলকারী সব যাত্রীবাহী নৌকায় লাইফ সাপোর্টে ব্যবস্থা রাখতে হবে। কোনোভাবেই যেন অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করা না হয় সেই বিষয়টি ঘাটে দায়িত্বরতদের নিশ্চিত করতে হবে। এর দায়-দায়িত্ব ঘাট পরিচালনা কমিটিকে গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ঘাটে যেন বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে জেটি বা পন্টুন থাকে সে বিষয়টি সুপারিশে উল্লেখ থাকবে।

এদিকে দুর্ঘটনার পর থেকে নৌকার মাঝি হিসেবে পরিচিত ‘সোনা মাঝি’ পলাতক রয়েছেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর ইউনিয়নের ছতুরপুর গ্রামে।

মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্য ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল রেজা জানান, নৌকাডুবির ঘটনায় ২৮ আগস্ট দুই বাল্কহেডের মালিক, চালক ও তার সহযোগীসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি দায়ের করেন নৌ দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চারজন নিহত পরিবারের সদস্য বিজয়নগর চম্পকনগর ইউনিয়নের গেরাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মো. সেলিম মিয়া। মামলায় এমভি ‘ইয়া রাসূল আল্লাহ’ বাল্কহেডের তিন চালক ও সহযোগী জমির মিয়া, মো. রাসেল, খোকন মিয়া এবং মালিক মো. সোলায়মানকে আসামি করেন।

‘এ ছাড়া অপর বাল্কহেড এমভি রউফ শাহী নৌযানের মালিক মোস্তফা মিয়া এবং চম্পকনগর নৌকাঘাট পরিচালনাকারী দুই সদস্য সোলাইমান মিয়া ও মিস্টু মিয়াকেও আসামি করা হয়েছে। তবে ডুবে যাওয়া ট্রলারের মাঝি সোনা মিয়া ও তার দুই সহযোগীকে এই মামলায় আসামি করা হয়নি।’

উল্লেখ্য, গত ২৭ আগস্ট শুক্রবার ট্রলারটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে চম্পকনগর বাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে ফেরার পথে সন্ধ্যা ৬টার দিকে শতাধিক যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পথে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বালুবাহী বাল্কহেডের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে যাত্রীবাহী ট্রলারটি ডুবে যায়। ৫০জনের মত যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও প্রাণ হারান ২৩ জন। আহত অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১৫ জন।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন