হোম জাতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা কতদূর এগোলো সেবার মান?

জাতীয় ডেস্ক :

মিনাজ হাসান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) অফিসের ফাঁকে দ্রুত টাকা জমা দিতে আসেন প্রগতি সরণির একটি বেসরকারি ব্যাংকে। কিন্তু দীর্ঘ লাইন দেখে তিনি বুঝতে পারেন, টাকা জমা দিতে চাইলে অপেক্ষা করতে হবে ঘণ্টাখানেক।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সেবাদানে দীর্ঘসূত্রিতা এখন পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারেনি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো। সরেজমিনে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ ব্যাংকেই গ্রাহকের বিপরীতে নেই পর্যাপ্ত সেবা প্রদানকারী ব্যাংক কর্মকর্তা।

বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলোতে সেবা প্রদানে ঘাটতি রয়েছে বলে জানান গ্রাহকরা। মতিঝিলের একটি সরকারি ব্যাংকের নিচে সময় সংবাদের সঙ্গে কথা হয় হাবিবুর রহমানের। তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের হাবভাব দেখলে মনে হয় জমিদার তারা। বিপদে পড়ে তাদের কাছে এসেছে। এখানে যে তারা সেবা দিচ্ছে এটা তাদের আচরণে প্রকাশ পায় না।

আরেকজন গ্রাহক আসমত আলি বলেন, ‘সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা গ্রাহকদের বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেন না। আমি বলছি না সবাই, তবে সিংহভাগেরই এ অবস্থা। আমি ঋণ নিতে এসেছিলাম। তারা কী বুঝাল কিছুই বুঝলাম না। এমনতো না যে আমি খোশগল্প করতে এসেছি।’

সরকারি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে এসে বিপাকে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আশফাক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘শুরুতে সব ঠিকই ছিল। কিন্তু পরে এসে তারা জানাল অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে আমার আরেকটি এই ব্যাংকেরই রেফারেন্স অ্যাকাউন্ট দেখাতে হবে। এই ব্যাংকে তো পরিচিত কারো অ্যাকাউন্ট নেই। এটা কেমন নিয়ম? আমার মনে হয়, অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ করা উচিত।’

সরকারি ব্যাংকের সেবা নিয়ে আরেকজন গ্রাহক বলেন, ‘আমি একটি কাজে মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকে গিয়েছিলাম। আমাকে অপেক্ষা করতে দেখে ব্যাংক ম্যানেজার নিজে থেকে উঠে এসেছে। কীভাবে সাহায্য করতে পারে জানতে চেয়েছেন। এটা কিন্তু সরকারি ব্যাংকে দেখা যায় না। অথচ সরকারি ব্যাংকগুলো চলে আমাদেরই টাকায়। আমাদের টাকায় তাদের বেতন-ভাতা হয় আর আমাদের সেবা দিতে তারা গাফিলতি করে।’

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সালাউদ্দিন খান। সম্প্রতি তিনি ঋণের জন্য একটি শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকে আবেদন করেছেন। সব কাগজপত্র জমা দেয়ার পরেও তিনি ঋণ পাচ্ছেন না। সময় সংবাদকে তিনি বলেন, ‘আমার বাসায় ব্যাংকের লোক এসে দেখে গেছে সব ঠিকঠাক আছে কি-না। আমার কাগজপত্র ঠিক আছে তারা জানিয়েছেন। পরে যখন ঋণের জন্য অগ্রগতি জানতে ফোন দিলাম তারা বললো জানানো হবে। তিন মাস পার হয়ে গেছে তারা একই কথা বলছে। এটাতো কোনো সেবার মান হতে পারে না। আপনি হয় বলবেন ঋণ পাবেন, না হলে বলবেন পাবেন না। ঝুলিয়ে রাখার তো কোনো মানে নেই।’

শান্তিনগর চামেলিবাগের একটি অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তাকর্মী সামসুল হক। প্রতি মাসেই বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল দিতে ব্যাংকে যেতে হয় তার। তিনি বলেন, ‘আমি বয়স্ক গরিব মানুষ। লুঙ্গি পরে ব্যাংকে গেলে, কিছু জানতে চাইলে, লিখতে একটু ভুল করলে- তারা এমন একটা ভাব করে যে পাপ করে ফেলাইছি আমি। ক’দিন আগে স্যারকে বলে দিছি আমি আর ব্যাংকে যেতে পারব না।’

পোশাক দেখে প্রাইভেট ব্যাংকগুলোতে সেবা দেয়া হয় কি-না জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রাইভেট ব্যাংক কর্মকর্তা সময় সংবাদকে বলেন, ‘এটা ব্যাংক কর্মকর্তার মানসিকতার ব্যাপার। আমাদের কাছে সব গ্রাহক সমান। কাউকে যদি পদবী কিংবা পোশাকের জন্য ছোট করে দেখা হয়, তাহলে তিনি অভিযোগ করতে পারেন। ক’দিন আগেও এরকম অভিযোগের ভিত্তিতে চারজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে।’

টাকা জমা দেয়া ও তোলার ব্যাপারে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে আরেক ব্যাংকার বলেন, ‘এখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে এটিএম বুথ আছে। সেখানে আপনি টাকা জমা দিতে ও তুলতে পারবেন। অনেক সময় শাখাগুলোতে পর্যাপ্ত লোকবল থাকে না। তবে বিকল্প ও সহজ পথ কিন্তু খোলাই আছে।’

স্বাধীনতার পর থেকে পাঁচ দশক পার করেছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর। এর মধ্যে বেড়েছে ব্যাংকের সংখ্যা, শাখা-উপশাখা ও লেনদেন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এছাড়া আর্থিক লেনদেনেও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু এতকিছুর পরেও বাড়েনি সেবার মান। দেশের মানুষের মনে ব্যাংকিং সেবা নিয়ে এখনো রয়েছে নানা রকম ভীতি ও অস্বস্তি। ব্যাংকিং খাত যতই বিস্তৃত হোক, সেবার মান না বাড়লে বড় রকমের পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন