আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট, যুদ্ধবিরতি এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্ররাই এখন বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। আর এতে লাভবান হচ্ছে ওয়াশিংটনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা।
এই প্রণালিপথ দিয়ে বিশ্বে মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক বিমান হামলার পর ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দেয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্র দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র আগাম জানায়নি বা অংশগ্রহণের আহ্বানও জানায়নি। কিন্তু তেলের দাম বেড়ে গেলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্রদের সমালোচনা করে বলেন, যারা জ্বালানি চায়, নেতৃত্ব দিয়ে তাদেরই ‘নিজেদের তেল নিজেরাই সংগ্রহ’ করা উচিত।
এই বার্তাই এখন বাস্তবে প্রতিফলিত হতে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। কারণ, এই অঞ্চলের দেশগুলো হঠাৎ করেই তাদের প্রধান জ্বালানি আমদানি উৎস হারিয়েছে এবং বৈশ্বিক তেল সংকটের প্রথম ধাক্কা সেখানেই লেগেছে।
তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জাপান, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইন এরইমধ্যে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে। একই সঙ্গে অনেক দেশ রাশিয়া থেকে আরো বেশি জ্বালানি কিনছে।
অন্যদিকে, চীন সংকট মোকাবিলায় সহায়তার ইঙ্গিত দিয়ে অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন এমনকি তাইওয়ানের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, যার অন্যতম শর্ত ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। এতে তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমার আশা করা হলেও বাস্তব প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র প্রণালি খুলে দেওয়ার সাফল্যের কথা বললেও ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও তাদের সামরিক বাহিনী জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে এবং যুদ্ধ শেষ হয়নি বলেও সতর্ক করেছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও প্রণালিপথ দিয়ে খুব অল্পসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে, যেখানে যুদ্ধের আগে এটি ছিল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নৌপথ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতির প্রভাব জ্বালানি বাণিজ্য ও আঞ্চলিক জোট ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্র-এশিয়া সম্পর্কেও।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনির অধ্যাপক রক শি বলেন, এই সংকট যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে। দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও তারা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ বন্ধ হওয়া ঠেকাতে পারেনি। এখন এশিয়ার মিত্ররা ভাবছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতা আদৌ জ্বালানি সরবরাহ পথ পর্যন্ত বিস্তৃত কি না।
তার মতে, এশিয়ার দেশগুলো এখন জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যময় করার দিকে গুরুত্ব দেবে। যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকেও তেল-গ্যাস কেনা তালিকায় থাকবে।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই সংকট একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-এশিয়া জোটকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে চাপও তৈরি করছে। মিত্ররা এখন ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনবে, আবার নিজেদের সক্ষমতাও বাড়াবে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে এশিয়ায়। জ্বালানি সাশ্রয় এবং নতুন উৎস নিশ্চিত করতে দেশগুলো ছুটছে। তবে গবেষকদের মতে, বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়ায় তাদের দুর্বলতা ও সক্ষমতার পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
ফিলিপাইন প্রথম দেশ হিসেবে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে। দেশটি পাঁচ বছর পর প্রথমবারের মতো রাশিয়া থেকে তেল আমদানি শুরু করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা পুনরায় শুরু করেছে।
জাপানের কাছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৌশলগত তেল মজুত রয়েছে, গত মাসে রেকর্ড পরিমাণ মজুদ তেল বাজারে ছেড়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, তিনি ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নিচ্ছেন। একই সময়ে জাপানের গণমাধ্যম এনএইচকে জানিয়েছে, দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি জাহাজ এরইমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়াও ইরানে বিশেষ দূত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে, যাতে তাদের জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা যায়। এর আগে তারা কাজাখস্তান, ওমান ও সৌদি আরবে দূত পাঠিয়ে তেল ও ন্যাফথা সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগে চার বছর পর প্রথমবারের মতো রাশিয়া থেকে ন্যাফথা আমদানি করেছে দেশটি।
অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিবিদ রবার্ট ওয়াকার বলেন, প্রতিটি দেশের পদক্ষেপ নির্ভর করছে তাদের কূটনৈতিক সক্ষমতা, প্রভাব ও কতটা জরুরি তার ওপর। তার মতে, চীন দ্রুত ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারায় সংকটের শুরুতেই নিজেদের জাহাজ নিরাপদে পার করতে সক্ষম হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জন কয়েন সতর্ক করে বলেন, রাশিয়ার তেল আমদানি বাড়ানো বা ইরানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রদের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, এখানে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে—ইরান কি এই তেল অন্য দেশে পাঠাতে দেবে? আর যুক্তরাষ্ট্র সেটিকে কীভাবে দেখবে?
এই চাপ শুধু এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। ফ্রান্স ও ইতালিও তাদের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে। অন্যদিকে, ইরান পাল্টা হামলায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে।
জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে রাশিয়া ও ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে আগে তাদের তেল খাত চাপের মুখে ছিল। কিন্তু সংকটের কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।
মার্কিন প্রশাসন এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত কিছু জ্বালানি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় শুধু মার্চ মাসেই রাশিয়ার অতিরিক্ত ৩.৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সময়ে বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধের আগে ইরান যেখানে ব্যারেল প্রতি ৪০-৪৫ ডলার দরে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল তেল বিক্রি করত, এখন তা বেড়ে ১৭ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। আর দাম ছাড়িয়েছে ১০০ ডলার। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য যদি প্রতিটি জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার করে নেওয়া হয়, তবে সাপ্তাহিক প্রায় ৬ কোটি ডলার আয় হতে পারে।
এই সংকটে পরোক্ষভাবে লাভবান হতে পারে আরেক পরাশক্তি চীন। বড় তেল মজুত, স্থলভিত্তিক পাইপলাইন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতির কারণে চীন এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে।
দেশটি জ্বালানি রফতনিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এমনকি তাইওয়ানকে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রস্তাব দিয়ে শান্তিপূর্ণ একীকরণের ইঙ্গিতও দিয়েছে। পাশাপাশি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেছেন।
বিশ্লেষক রক শি মনে করেন, চীন চাইলে এশিয়ার জ্বালানি ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। যদি তারা সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরে, তাহলে পুরো অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে যেতে পারে।
