হোম অর্থ ও বাণিজ্য জীবাশ্ম জ্বালানির ভবিষ্যত কী?

বাণিজ্য ডেস্ক :

বর্তমান শতকের শুরু থেকেই পশ্চিমা বিশ্বের নীতি নির্ধারকরা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ ফের বিশ্বের মনোযোগ টেনে এনেছে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি। এ সঙ্কট দেখিয়ে দিয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বর্তমান সভ্যতার নির্ভরতা কতখানি।

আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহৃত খনিজ তেল, গ্যাস ও কয়লার উৎস মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি। সে হিসেবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্বের বর্তমান জ্বালানি সঙ্কটকে জীবাশ্ম জ্বালানি সঙ্কটও বলা যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী ৮০ শতাংশ শক্তির উৎস এই তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস।

বিশ্বের দেশে দেশে দ্বন্দ্ব এবং সুপার পাওয়ারগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে এই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নিয়ন্ত্রণের বাসনা।

জীবাশ্ম জ্বালানি কী?

ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি হলো এক ধরনের হাইড্রোজেন ও কার্বন জাত যৌগ, যাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মূলত মৃত গাছ, গাছের পাতা, মৃতদেহ ইত্যাদি জীবনের উপাদান বা ফসিল লাখ লাখ বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে এক ধরনের উপাদান তৈরি করে যেখানে উচ্চ মাত্রায় কার্বনের উপস্থিতি থাকে। এই উপাদানকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জীবাশ্ম থেকে উৎপাদিত হয় বলেই একে জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েল বলে। জীবাশ্ম জ্বালানির প্রধান উৎস কয়লা, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস।

কেন জীবাশ্ম জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বে ব্যবহৃত জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎস হলো এই জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েল। ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বের প্রাথমিকভাবে ব্যবহৃত জ্বালানির ৮৪ শতাংশের উৎস জীবাশ্ম জ্বালানি। এছাড়া বিশ্বের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬৪ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে।

জীবাশ্ম জ্বালানি মূলত পুনর্ব্যবহারযোগ্য। অর্থাৎ একবার ব্যবহারের পরই শেষ এর উপযোগিতা। কিন্তু বিশ্বে জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বায়ু বা সৌরশক্তির মতো প্রাকৃতিক উৎস থেকে জ্বালানির ব্যবহার বিশ্বে বেড়ে চললেও তা জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না। প্রতি বছরই আগের বছরের থেকে ১ শতাংশ করে বাড়ছে জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা। অথচ মাটির নিচে জীবাশ্ম জ্বালানি তৈরি হতে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর লেগে যায়।

পরিবেশের ওপর জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব

জীবাশ্ম জ্বালানির এ বিপুল ব্যবহার বিশ্বের পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ। বিশ্বে মানব সৃষ্ট কার্বন ডাই অক্সাইডের ৮০ শতাংশের উৎপাদন হয় জাবীশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে। প্রতি বছর যার পরিমাণ ৩৫ বিলিয়ন টন। জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমে পৃথিবীতে যে বায়ুদূষণ হচ্ছে, তাতে প্রতিবছর বিশ্বের ৪০ লাখেরও বেশি মানুষের অপমৃত্যু ঘটে।

সম্প্রতি ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের প্রকাশিত গ্রিনপিস সাউথ-ইস্ট এশিয়া এবং সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের করা ওই গবেষণা নিবন্ধে দেখা গেছে, তেল, গ্যাস আর কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বায়ুদূষিত হয়ে বিশ্বে যত মানুষের মৃত্যু হয় তা গোটা বিশ্বের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের সংখ্যার তিনগুণ।

আর কতদিন বিশ্বের চাহিদা মেটাবে জীবাশ্ম জ্বালানি ?

পৃথিবীতে লাখ লাখ বছর আগে থেকেই জীবাশ্ম জ্বালানি থাকলেও মানব সভ্যতা তার ব্যাপক ব্যবহার শুরু করেছে মাত্র দুইশ’ বছর আগে থেকে। তবে এ মুহূর্তে ঠিক কতদিন জীবাশ্ম জ্বালানিতে চলবে তার হিসাব করাটা কঠিন। কারণ প্রায় প্রতি বছরই আবিষ্কৃত হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানির রিজার্ভ।

তবে ২০১৫ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৫১ বছরের মধ্যে তেল, ১১৪ বছরের মধ্যে কয়লা এবং ৫৩ বছরের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসবে। তবে আরও কিছু গবেষণা প্রতিবেদনে আগামী ২০৫২ সালের মধ্যেই তেলের মজুত ফুরিয়ে আসার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

বিশ্বে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানির পরিমাণ

২০১৯ সালে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির মধ্যে উৎস হিসেবে জ্বালানি তেল থেকে এসেছে ৩৩ শতাংশ, কয়লা থেকে ২৭ শতাংশ, প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে ২৪ শতাংশ, পরমাণু শক্তি থেকে ৪ শতাংশ, জলবিদ্যুৎ থেকে ৬ শতাংশ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক জ্বালানি থেকে ৫ শতাংশ।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জ্বালানি কোম্পানি মেটগ্রুপের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে বিশ্বে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৬২ টেরাওয়াট আওয়ার সমপরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হয়েছে। ১০ লাখ মেগাওয়াট আওয়ারে এক টেরাওয়াট আওয়ার।

জীবাশ্ম জ্বালানির মধ্যের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় খনিজ তেল। বিশ্বে ২০১৯ সালে ৫৩ হাজার ৬২০ টেরাওয়াট আওয়ার সমপরিমাণের খনিজ তেল ব্যবহার হয়েছে। এর পরপরই আছে কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস। ৪৩ হাজার ৮৪৯ টেরাওয়াট আওয়ারের সমপরিমাণ কয়লা এবং ৩৯ হাজার ২৯২ টেরাওয়াট আওয়ার সমপরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে ২০১৯ সালে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে জীবাশ্ম জ্বালানির সম্পর্ক

বিশ্বের বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় সব দেশই জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে বেশি জোর দেয়। কারণ এটাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাপকাঠি। কিন্তু এই জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের সরাসরি সংযোগ রয়েছে।

২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে গড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এই সময়ের মধ্যে বিশ্বের জ্বালানির চাহিদাও বাড়বে কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ। যার বেশিরভাগই আসবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন