হোম আন্তর্জাতিক চীনের সঙ্গে ন্যাটোর দ্বন্দ্বে জড়ানো উচিত নয় কেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর কি উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সঙ্গে দ্বৈরথে নামা উচিত? বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু এর উত্তর মেলা কঠিন।

সম্প্রতি রোমানিয়ার বুখারেস্টে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুদিনের সম্মেলেন ছিল। সেখানে খাতা-কলমে ইউক্রেন যুদ্ধ মূল আলোচ্য বিষয় হলেও দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়েছে চীনকে নিয়ে। এর কৃতিত্ব অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটি চেয়েছে, চীনকে নিয়ে তারা যে আশঙ্কা-শঙ্কার দোলাচলে ভুগছে তা ন্যাটো জোটে ছড়িয়ে দিতে। এ প্রচেষ্টায় জো বাইডেন প্রশাসন আংশিকভাবে হলেও সফল হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ঘোষণা দিয়েছে, তারা চীন নির্ভরতা কমাবে। বিশেষ করে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে চীনের একচেটিয়া প্রভাবকে তারা পাশ কাটানোর চেষ্টা করবে। এছাড়া চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যকে কঠিন করে তুলতে বিভিন্ন বিধিনিষেধও আরোপ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর এমন পরিকল্পনা হিতেবিপরীত হতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, চীনের উত্থান যতই যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর মাথাব্যথার কারণ হোক না কেন, চীনের সঙ্গে তাদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়া ঠিক হবে না। ইউরোপ-আমেরিকার গণ্ডি ছেড়ে এশিয়ায় এসে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অন্যতম নিয়ামক হয়ে ওঠা ন্যাটোর জন্য মঙ্গলজনক হবে না। বিশেষ করে ইউরোপের নিরাপত্তাই যেখানে টালমাটাল।

বিগত কয়েক বছর ধরে চীনের ক্রমাগত উত্থানের বিপরীতে ন্যাটো ক্রমশ বেইজিংয়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেকে বদলে নিচ্ছে। অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে ন্যাটো চীনকে টেক্কা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আবার এ জোটের দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বিশাল বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।

দেশগুলো একটা সময় মনে করতো, চীনের সঙ্গে তাদের এ সম্পর্ক হয়তো দেশটিতে স্বাধীনতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে পশ্চিমা মূল্যবোধ বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিষয়টি ইউরোপের নেতারাও বুঝতে পেরেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক তো একধাপ এগিয়ে ন্যাটোর এমন চাওয়াকে ‘শিশুসুলভ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ন্যাটো ঐতিহাসিকভাবেই চীনকে একটি প্রতিকূল শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের ব্যাপারে ন্যাটোর নীতি দ্ব্যর্থক। যেমন ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ চীনকে একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ২০২২ সালে প্রকাশিত ন্যাটোর কৌশলগত ধারণাপত্রে চীনকে আবার প্রতিপক্ষ বলে উল্লেখ করা হয়। চীনের বৈশ্বিক নীতিকে ‘জবরদস্তিমূলক’ বলে আখ্যা দিয়ে সম্প্রতি মস্কো-বেইজিং সম্পর্ক নিয়ে ‘আশঙ্কা’ ব্যক্ত করে পুরো একটি অনুচ্ছেদই রচনা করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ন্যাটো যদি এশিয়ায় চীনকে মোকাবিলা করতে চায়, তবে তা সবদিক থেকেই ব্যয়বহুল হবে। পক্ষান্তরে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’ নিজ বলয় থেকে না সরায় চীনকে এই বাবদ ব্যয় খুব বেশি বাড়াতে হবে বলে মনে হয় না। ফলে, চীন শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা আটকানো ন্যাটোর বর্তমান কাঠামোর জন্য উপযুক্ত নয়।

কারণ ন্যাটোর গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জোটের উদ্দেশ্য হলো উত্তর আটলান্টিকের স্থিতিশীলতা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। অথচ চীন ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত থেকে আড়াই হাজার মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থিত। ফলে ভৌগোলিকভাবে বলতে গেলে, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্য চীনের গণমুক্তি ফৌজ বা পিএলএ সেভাবে হুমকি নয়।

তাই ইউরোপ ছেড়ে ন্যাটোর আওতা এশিয়ায় সম্প্রসারণের অর্থই হলো জোটের দেশগুলোর অস্তিত্ব প্রশ্নের বিষয়টি ঝুঁকির মুখে ফেলা। কারণ, তখন ন্যাটোকে তার সোভিয়েত আমলের প্রতিপক্ষ রাশিয়ার বাইরেও এমন এক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে হবে যা তুলনামূলক পরিপক্ব, শক্তিশালী এবং তার প্রভাবের বিস্তার বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

ন্যাটোর কেন চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে বিবেচনা করা উচিত হবে না, তার দ্বিতীয় আরেকটি কারণ রয়েছে। তা হলো, বিগত ৭৫ বছরের ইতিহাসে ইউরোপ বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ একটি যুদ্ধের (ইউক্রেন যুদ্ধ) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব অনুসারে, এ যুদ্ধে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের উভয়পক্ষের অন্তত লাখ খানেক সেনা হতাহত হয়েছেন। বেসামরিক নাগরিক হতাহত হওয়ার বিষয়টি আমলে নিলে সংখ্যা আরও বাড়বে।

অনেকে মতে, এ সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। কারণ বিবাদমান দুপক্ষের মধ্যে এখনও আলোচনার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে ২০২৩ সালেও হয়তো যুদ্ধ চলতে থাকবে। এ বিষয়টি আমলে নিয়ে ন্যাটোর উচিত হবে নিজেদের সংকট নিরসনেই বেশি মনোযোগ দেয়া এবং কোনোভাবেই চীনকে নিজেদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় না করানো।

এছাড়া ন্যাটো নিজেই নানাবিধ সমস্যায় ডুবে আছে। এর একটি হলো বাজেট। যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে ন্যাটোর বাজেটের ৭০ শতাংশ পূরণ করে। ফলে জোটটির অনেক নীতিও নির্ধারণ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর বাইরে ন্যাটোর অধিকাংশ সদস্য দেশের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য নয়। এমনকি পূর্ণাঙ্গ একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ন্যাটোর অন্য সদস্য দেশগুলো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতেও সক্ষম নয়। তাই চীনের মতো একটি শক্তির সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে একাধিক ফ্রন্টে ন্যাটো কীভাবে অবদান রাখবে তা অস্পষ্ট।

তৃতীয় যে কারণে ন্যাটোর চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো উচিত হবে না সেটি হলো, চীনকে জোটের মূল প্রতিপক্ষ ভাবলে এর ভূরাজনৈতিক এবং কৌশলগত ফলাফল কী হবে তা বিবেচনায় নেয়া। কারণ, ন্যাটো চীনের পথের কাটা হয়ে দাঁড়ালে বেইজিংও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। জবাবে, রাশিয়ার পাশাপাশি এশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে চীন তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করবে।

এর ফলে, চীন-রাশিয়ার মধ্যে সামরিক এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা, ইউরোপে চীন-রাশিয়ার যৌথ গোয়েন্দা অপারেশন পরিচালনা আরও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রকে বিপর্যস্ত করতেও নানামুখী চেষ্টা বাড়বে এবং এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের শীর্ষ শক্তিগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা বেড়ে যাবে।

সবশেষে বলা যায়, ন্যাটো এরই মধ্যে যথেষ্ট অর্জন করেছে। তবে যে সময়ে জোটটির নিজের মূল লক্ষ্যের প্রতি আরও মনযোগী হওয়ার কথা ছিল, সে সময়েই তারা সেখান থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। যা ন্যাটোর কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে বলেই মনে করছেন কেউ কেউ।

এশিয়া টাইমস থেকে অনূদিত

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন