জাতীয় ডেস্ক :
টানা দুইদিন খাঁচায় বন্দি থাকার পর অবশেষে বনে ফিরেছে বিরল প্রজাতির গ্রিন পিট ভাইপার সাপটি। বন বিভাগের সহায়তায় প্রায় চার ফুট লম্বা বিষধর সাপটি শুক্রবার (২২ জুলাই) রাতে উপজেলার একটি গহীন বনে অবমুক্ত করেছে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং’ এর সদস্যরা।
এর আগে গত বুধবার (২০ জুলাই) রাতে উপজেলার সদর ইউনিয়নের চন্দ্রকোনা গ্রামের এমদাদুল হক (৩৫) নামের এক ব্যক্তির ডান পায়ে দংশন করে সাপটি। এ সময় স্থানীয়রা সাপটিকে মারতে গেলে কয়েকজন বাধা দেন এবং সেটিকে আটক করেন।
কিন্তু সবুজ রঙের এবং সম্পূর্ণ নতুন ধরনের সাপ দেখে দংশনের শিকার এমদাদুলসহ তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।পরে সাপটিসহ দংশনের শিকার এমদাদুলকে তাৎক্ষণিক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে এন্টিভেনম ইনজেকশন দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
এমদাদুল হক জানান, গত বুধবার রাতে চন্দ্রকোনা গ্রামের নিজ বাড়িতে কাজ করছিলেন তিনি। বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারে কাজ করার সময় তার ডান পায়ে গোড়ালির নিচে কিছু একটা কামড় দেয়। পোকাকামড় দিয়েছে ভেবে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে আলো জ্বালতেই তিনি সবুজ সাপটিকে দেখতে পান ও চিৎকার করে ওঠেন। তার চিৎকার শুনে আশেপাশের লোকজন ছুটে এসে সাপটিকে আটক করে ইঁদুরের খাঁচায় বন্দি করেন এবং তাকেসহ সাপটি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। হাসপাতালে এন্টিভেনম প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টা পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন এমদাদুল।
দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার ডা. তাজিরুল ইসলাম রায়হান জানান, বিষধর সাপে কাটা রোগীটিকে হাসপাতালে আসার পরপরই তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছি। বিষাক্ত সাপটিকে দ্রুত শনাক্ত করে এন্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে অবজারভেশনে রেখেছিলাম। জটিল কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকায় ও সম্পূর্ণ সুস্থবোধ করায় রোগীটিকে ২৪ ঘণ্টা পর ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, গ্রিন পিট ভাইপারের দংশন ও সাপটিকে আটক করার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং এর স্বেচ্ছাসেবকরা। রোগীর খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি সাপটিকে উদ্ধার করে তারা। শুক্রবার বিকেলে এমদাদুল হক আনুষ্ঠানিকভাবে বিষধর সাপটি সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং এর স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে হস্তান্তর করেন।
দুর্গাপুর রেঞ্জ বন বিভাগের প্রহরী ফারুক আহমেদ জানান, শুক্রবার রাতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং এর সদস্যরা একটি বিষধর সাপ বনে অবমুক্ত করেছে। আমরা তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছি।
তিনি বলেন, এই স্বেচ্ছাসেবকরা এর আগেও অনেকগুলো বন্যপ্রাণী বনে অবমুক্ত করেছেন। এর মধ্যে অজগর সাপ, বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর, মেছোবাঘের ছানা, গন্ধগোকুলসহ বিভিন্ন প্রাণী রয়েছে। এতে অত্র এলাকার জীববৈচিত্র্য স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং মানুষও সচেতন হচ্ছেন।
সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং এর সভাপতি রিফাত আহমেদ রাসেল জানান, গ্রীন পিট ভাইপার একটি বিষধর সাপ। এর আগে সুসং জনপদে এই সাপ দেখা যায়নি। তবে গত এক সপ্তাহে দুইটি গ্রিন পিট ভাইপার সাপ উদ্ধার হয়েছে। আমরা সতর্কতা অবলম্বন সাপটিকে বনে অবমুক্ত করেছি।
তিনি বলেন, এ পর্যন্ত মোট ২৭টি রেসকিউ অপারেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির বেশকিছু বন্যপ্রাণী উদ্ধারের পর বনে অবমুক্ত করেছি। তবে এবারই প্রথম কোনো বিষধর সাপ উদ্ধার করতে পেরেছি আমরা।
গ্রিন পিট ভাইপার সম্পর্কে বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জোহরা মিলা জানান, পিট ভাইপার vipreidae গোত্রের মৃদু বিষাক্ত সাপ। এই গোত্রের আরও দুটি উপগোত্র আছে। ভাইপার গোত্রের সব সাপের চোখ আর নাকের মাঝামাঝি স্থানে একধরনের পিট (Pit) বা গর্ত আছে দেখা যায়। এই পিট মূলত বিশেষ তাপ সংবেদী স্নায়ুতে পরিপূর্ণ যা সেন্সরের কাজ করে। যে সেন্সরে সাপেরা ইনফ্রারেড শনাক্ত করতে পারে। এই পিট সেন্সরের কারণেই সাপটির নাম পিট ভাইপার হয়েছে। এই সাপটি দেশের সিলেট ও চট্টগ্রামের চিরসবুজ বনে দেখা যায়। সুন্দরবনেও এই সাপটি দেখার রেকর্ড আছে। সাপটি সবুজ বোড়া সাপ নামেও পরিচিত। পিট ভাইপারের তিনটি প্রজাতির তিনটিই সবুজ। এরা সাধারণত লম্বায় ২ মিটারের বেশি হয়। সাপটি মূলত নিশাচর, দিনের বেলায় ঘুমিয়ে বা ঝিমিয়ে কাটিতে দেয়। সূর্য ডোবার পর এরা শিকার করতে বের হয়।
তিনি বলেন, দেশের সব সাপের মধ্যে সবুজ রঙের এই সাপটি দেখতে অপূর্ব সুন্দর। সাপটি সাধারণত ব্যাঙ, পাখি, ইঁদুর ইত্যাদি উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট প্রাণী খেয়ে জীবনধারণ করে থাকে। তবে এর প্রধান খাদ্য ইঁদুর। সাধারণত উষ্ণ রক্তের প্রত্যেক জীবিত প্রাণী থেকে ইনফ্রারেড তরঙ্গ নির্গত হয়, ইঁদুরের গা থেকে অনবরত ছড়িয়ে পড়া ইনফ্রারেড তরঙ্গ শনাক্ত করে এই সাপ তাদের পিছু ধাওয়া করে শিকার করে। এরা ডিম পাড়ার বদলে বাচ্চা প্রসব করে।
নেত্রকোনায় গ্রিন পিট ভাইপার উদ্ধারের খবরে তিনি কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, নেত্রকোনোয় গ্রিন পিট ভাইপারের বসতি থাকার কথা নয়। সাম্প্রতিককালের বন্যায় ভেসে সাপটি হয়তো ওই এলাকায় গিয়ে থাকতে পারে।
সাপটিকে না মেরে জীবন্ত আটক ও পরবর্তী বনে অবমুক্ত করায় দংশনের শিকার এমদাদুল, গ্রামবাসী ও সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং এর সদস্যদের প্রশংসাও করেন এই বন কর্মকর্তা।
