আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
তালেবানরা ২০০১ সালে যখন প্রথমবারের মতো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন থেকে এ পর্যন্ত দেশটির সমাজ ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। এ অবস্থায় বর্তমান তালেবান প্রশাসনকে শাসনব্যবস্থা নিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতারা। আমস্টারডামভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান ফাউন্ডেশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের (ইএফএসএএস) আয়োজিত ‘আফগানিস্তান এবং তালেবানদের দখল পরবর্তী অঞ্চল’ শীর্ষক এক ওয়েব সেমিনারে তারা এসব কথা বলেন।
ইএফএসএএস – এর ওয়েব সেমিনারে অংশ নেওয়া বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আফগানিস্তান সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি হবে না, সেই ভাবনা বাস্তবতা বিবর্জিত। বরং দেশটি পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অভয়ারণ্য হয়ে উঠবে পারে।
আফগানিস্তানের সাবেক খনিজ, জ্বালানি ও শিল্পমন্ত্রী এবং এনজিও ‘ইকুয়ালিটি ফর পীস অ্যান্ড ডেমোক্রেসির’ প্রতিষ্ঠাতা নার্গিস নেহান বলেন, সম্প্রতি তালেবানদের ঘোষিত মন্ত্রী পরিষদ আফগানিস্তানের লিঙ্গ ও জাতিগত বৈচিত্র্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, তালেবানরা কোনো জনপ্রিয় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আসেনি। বরং তারা দেশের সুবিশাল দুর্নীতি, আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর আপেক্ষিক দুর্বলতা এবং ঐক্যবদ্ধ জাতীয় নের্তৃত্বের অভাবকে পুঁজি করে ক্ষমতা দখল করেছে।
২০২০ দোহা শান্তিচুক্তিতে তালেবানদের বিজয়ের কথাটি উল্লেখ ছিল আর এ কারণেই তালেবানরা আরও অনেক শান্তি প্রক্রিয়া অগ্রাহ্য করার সুযোগ পেয়েছে মন্তব্য করে সাবেক এই মন্ত্রী নেহান বলেন, সেখানে সবার ধারণার চেয়েও সামরিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। পরিস্থিতি এখন এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তালেবানদের বিজয়কে একটি আন্তর্জাতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে; বিষয়টিকে ‘অপেক্ষা করুন ও দেখুন’ কৌশলের মধ্যে ফেলেছে।
নেহান বলেন, তালেবানরা যখন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল তখন থেকে তাদের বর্তমান সামাজিক নীতিমালা ও মতাদর্শগত দিকনির্দেশনার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। এরপরেও তালেবানরা দেশ শাসনের ক্ষেত্রে এখন ভিন্নরকম সমস্যায় পড়বে কারণ সাধারণ আফগানদের মধ্যে নাগরিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে এবং তারা বিক্ষোভের মাধ্যমে তালেবানদের প্রতিরোধ করতে উদ্যোগী হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০০১ সালে তালেবানরা পরাজিত হওয়ার পর থেকে আফগান সমাজ অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন তালেবান প্রশাসনকে নানা রকম সমস্যায় পড়তে হবে।
তালেবান শাসনের সমর্থন না করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, সামাজিক সমন্বয় ও সামাজিক শান্তি রক্ষা হয় এমনভাবে নতুন প্রশাসনিক নকশা তৈরি করতে হবে।
নেহাল তার বক্তব্যে সর্বশেষ পাঞ্জশির উপত্যকায় মানবিক সহয়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আফগানিস্তানের এই সর্বশেষ অঞ্চলটিও এখন তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে। এ অঞ্চলে খুব দ্রুত ও কার্যকরভাবে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
সেমিনারে অংশ নিয়েছিলেন জেনেসিস নেটওয়ার্কের রিসার্চ ফেলো এবং ইএফএসএএসের রিসার্চ ফেলো ড. ডরোথি ভ্যান্ডাম। তিনি তার বক্তব্যের প্রথমেই আফগানিস্তানের আধুনিক গতিপথে পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনার ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভাগের পর পাকিস্তানের সামরিক বিভাগ ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সমতা নিশ্চিত করতে এবং পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে ঘেরাও রোধে গুরুত্ব দিয়েছে। আর এ কৌশলগ্রহণে দেশটি উপকৃতও হয়েছে।
ভ্যান্ডামের বর্ণনায় পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) দীর্ঘদিন ধরে এমন একটা কৌশল অবলম্বন করে আসছে যা রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখছে। আইএসআই তহবিল সরবরাহ, সদস্য নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, সাংগঠনিক সমন্বয়, সরাসরি সামরিক সহায়তা এবং নিরাপদ অশ্রয় দেওয়ার কারণে মোজাহিদিন, তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের মতো দলগুলো সংঘবদ্ধ হয়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেছেন, তালেবান ও আইএসআইয়ের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তা সহজে এগিয়ে যাচ্ছে না। আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয় পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সমস্যা পশতুনদের প্রতি উদাসীনতা এবং ইসলামপন্থীদের উৎসাহিত করতে পারে। এর ওপর আফগানিস্তানে তালেবান ও আইএসকেপির মতো সংগঠনগুলোর মধ্যে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া গৃহযুদ্ধের প্রভাব পাকিস্তানেও পড়তে পারে।
ভ্যান্ডামতার বলেন, তালেবানদের বিজয় পাকিস্তানের জন্য স্বল্পমেয়াদে সফলতা নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জন্য নেতিবাচক।
সেমিনারটিতে তালেবান এবং চীনের বেল্টঅ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের মধ্যে সম্ভাব্য মিথস্ক্রিয়া নিয়ে ড. ভ্যান্ডাম বলেন, চীন শুধুমাত্র আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতার জন্য অপেক্ষা করছে যাতে করে বিআরআইএর মতো সম্ভাব্য চুক্তিগুলো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি তালেবানদের জন্য তহবিলায়নের বড় সুযোগ এবং আফগানিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে চীনের কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু তারা দেশটির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর অপেক্ষায় রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সুইডেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সিপ্রির সাবেক জেষ্ঠ্য বিশ্লেষক ও বর্তমানে ইএফএসএএসের রিসার্চ ফেলো টিমোথি ফক্সলি বলেছেন, আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক থাকতে হবে। দেশটির সংঘর্ষের ইতিহাস অনুযায়ী তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি ২০ বছর আগের তুলনায় খুব বেশি পরিবর্তিত হবে না। তিনি মতামত দেন যে, বর্তমান তালেবান সরকার একটি সংখ্যালঘু শক্তি যারা একচেটিয়াভাবে সহিংসতা চালায় এবং তারা খুব কমই জনপ্রিয় সমর্থন ভোগ করবে বলে মনে হয়। বিশেষ করে সম্প্রতি ঘোষিত মন্ত্রীসভায় সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক বৈচিত্রতা নেই।
তিনি আরও বলেছেন, প্রায় রূপক উপায়ে বলা যায়, পাঞ্জশীরে চলমান যুদ্ধ এখন প্রতিহতের অন্যতম মিলনস্থল। তালেবানরা হয়তো এ অঞ্চল দখল করতে পারবে কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কারণ স্থানীয় দলগুলো গেরিলাযুদ্ধের কৌশল ব্যবহার করে।
ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের প্রভাষক ড. ওয়েদা মেহরান আফগানিস্তানের যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব ও শান্তিপ্রতিষ্ঠা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তালেবানদের কীভাবে সহিংস রাষ্ট্রের নায়ক হিসেবে দেখা হয় তার বর্ণনা করেছেন তিনি। এই তালেবানরা আফগান সম্প্রদায়ের সমর্থনও পাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা যদি ক্ষমতায় থাকতে চায় তাহলে তালেবানদের প্রশাসনিক পরিষেবা ও ক্ষমতারে চর্চা করার জন্য সহিংসতার মধ্যে সমঝোতা করতে হবে; অন্যথায় তাদেরকে বিদ্রোহের মুখোমুখী হতে হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মেহরান বলেন, তালেবানরা আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি না বানানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেটি বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। আল কায়েদা, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান এবং ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধারা আফগানিস্তানেই তাদের নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। তিনি প্যানেলকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, নবগঠিত সরকারে হাক্কানি নেটওয়ার্ককে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: এএনআই
