আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঠেকাতে তিউনিশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। প্রস্তাবিত এই অভিবাসন চুক্তির ফলে উত্তর আফ্রিকার দেশটি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। তবে পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, এই চুক্তির ফলে অভিবাসীদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। লঙ্ঘন হতে পারে মানবাধিকার।
ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদন মতে, আগামি দুই সপ্তাহের মধ্যেই এই চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে। তবে এর মধ্যে তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনের দেয়া প্রস্তাবে তিনি রাজি হবেন কিনা।
অভিবাসন চুক্তি বিনিময়ে ভন ডার লিয়েন তিউনিশিয়াকে ৯০ কোটি ইউরো (১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) অর্থনৈতিক সহায়তা প্যাকেজ ছাড়াও তাৎক্ষণিক বাজেট সহায়তার জন্য ১৫ কোটি ইউরো (প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার সমান) এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রমে সহায়তায় আরও সাড়ে ১০ কোটি ইউরো (প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা) দেয়ার প্রস্তাব করেছেন।
এই প্রস্তাবের শেষ অংশটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন পর্যবেক্ষকেরা। তারা বলছেন, এর মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে অভিবাসন মোকাবিলায় তিউনিশিয়াকে ভূমিকা রাখার দিকেই ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের ফেলো হামজা মাদেব বলেন, ‘প্রস্তাবিত ইইউ’র আর্থিক প্যাকেজ তিউনিশিয়ার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করবে। কিন্তু চুক্তিটি অভিবাসন ইস্যুতে তিউনিশিয়ার পূর্ণ সহযোগিতার জন্যও বাধ্য করবে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের খসড়া অভিবাসন নীতির ফলে ইতালির আশ্রয়প্রার্থী ও অভিবাসীদের তিউনিশিয়ার মতো দেশগুলোতে ফেরত পাঠাতে পারবে। এই খসড়া প্রকাশের কয়েকদিন পরই তিউনিশিয়ার কাছে অর্থনৈতিক সহায়তার প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়।
ইতালির উপকূল থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরেই তিউনিশিয়া উপকূল। ফলে ইউরোপে পাড়ি দিতে চাওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য অন্যতম জনপ্রিয় একটি রুটে পরিণত হয়েছে দেশটি।
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৩ হাজার ৮০০ অভিবাসনপ্রত্যাশী তিউনিশিয়া থেকে তাদের দেশে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের তুলনায় এ বছর ছয় মাসেই দ্বিগুণ অভিবাসী এসেছে।
এই পথে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকা ডুবে প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। জাতিসংঘের অভিবাসী বিষয়ক সংস্থা আইওএম’র মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট অনুসারে, ২০২৩ সালের প্রথম চার মাসেই অন্তত এক হাজার মানুষ মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬৯০ জন।
গত সোমবার (১২ জুন) তিউনিশিয়া সফরে যান ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ভন ডার লিয়েন। সফরকালে তিনি বলেন, ‘আমাদের [ইইউ ও তিউনিশিয়া] উভয়েরই চোরাকারবারি ও পাচারকারীদের ব্যবসায়িক মডেল ভেঙে ফেলার ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।’
তবে প্রস্তাবিত চুক্তি আসলেই পরিস্থিতির উন্নতি করবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। যেমনটা বলছেন তিউনিসে ইইউ ভিসার জন্য অপেক্ষায় থাকা সুদানি শরণার্থী মোহাম্মদ হামেদ। তিনি বলেন, ‘তিউনিশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে চুক্তি যাই হোক না কেন, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে অভিবাসনপ্রত্যাশী ও শরণার্থীদের। এটা দুর্ভাগ্যজনক।’
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রস্তাবিত অভিবাসন চুক্তিটিকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে না। সংস্থার শরণার্থী ও অভিবাসী অধিকার বিভাগের গবেষক লরেন সাইবার্ট বলেন, ‘ইইউ তিউনিশিয়া থেকে অনিয়মিত পথে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যাত্রা বন্ধ করতে চাইছে, এটি অত্যন্ত সমস্যাজনক। প্রত্যেকেরই তাদের নিজ দেশ ছেড়ে যেকোনো দেশে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। রয়েছে আশ্রয় চাওয়ার অধিকার। এই চুক্তি মানুষকে দেশত্যাগের সেই অধিকার লঙ্ঘন করবে।’
সাইবার্ট আরও বলেন, ‘ইইউ কয়েক বছর ধরে লাখ লাখ ইউরো খরচ করছে। সহায়তার নামে ‘অভিবাসন ব্যবস্থাপনা’ মূলত তিউনিশিয়ায় অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রনেরই উদ্যোগ।’ আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত অভিবাসন চুক্তির অর্থ শুধুমাত্র ‘পুলিশ ও সমুদ্রের ন্যাশনাল গার্ডসহ তিউনিশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকেই শক্তিশালী করবে।’
