জাতীয় ডেস্ক :
বিয়ে মানেই ধুমধাম আয়োজন, স্বজনদের হৈ-হুল্লোড়, আনন্দ আর আতশ বাজির ঝলকানি। এসব তখনই হরিষে বিশাদ, যখন দেনমোহরের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বিচ্ছেদে গড়ায় শুভ এ পরিণয়। বর্তমানে বিয়েতে অতিরিক্ত কাবিন নিয়ে চলছে একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এ প্রবণতা যেমন অস্বস্তি আর কলহ বাড়াচ্ছে, তেমনি গড়াচ্ছে বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত। সম্প্রতি প্রবাসী অধ্যুষিত ফেনীতে এমন ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন সচেতন মহল।
সোহেল পারভেজ নামের এক প্রবাসী আক্ষেপ করে বলেন, সংসার জীবনের শুভ সূচনা করতেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। সে সময় মেয়ে পক্ষের দাবিতে দেনমোহর ১৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মাস ছয়েক পরে ছুটি শেষে আবারও প্রবাসে পাড়ি দিতে হয়েছে পারভেজকে। এভাবেই কেটেছে আরও তিন মাস। এর কিছুদিন পর পারভেজের স্ত্রী তাকে তাকে বার বার দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করার কথা বলে।
এরই মধ্যে পারভেজ দেশে আসে। তখন পারভেজ তার স্ত্রীর পরকীয়ার কথা জেনে যায়। পরে তার শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে জানালে আমার স্ত্রী সংসার করবে না বলে ছাপ জানিয়ে দেয়। এ বিষয়ে আমার কোন দোষ না থাকলেও সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকা দিয়ে আমাদের বিবাহিত জীবনের ইতি টানতে হয়েছে। হয়তো মোটা অংকের কাবিনের জন্য এমন পরিণতি বলে মনে করেন পারভেজ।
অন্যদিকে তিন সন্তানের জননী ৩৬ বছর বয়সি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার এক নারীর দেখা মিলল আদালতের বারান্দায়। তার স্বামী পাশের জেলায় অপর এক স্বামী পরিত্যক্ত নারীর সঙ্গে নতুন করে সংসার শুরু করেছেন। এর আগে তার স্বামী দেনমোহরের এক লাখ টাকা বুঝিয়ে দিয়ে তালাকের নোটিশ হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। এই নারী বিশ্বাস করেন, দেনমোহরের টাকার অংক একটু বেশি হলে হয়তো এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।
ফেনী জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের তথ্য মতে, চলতি বছরে ৯ মাসে এ অফিসে স্বামী-স্ত্রীর বিভিন্ন বিরোধে ৪২৮টি অভিযোগ পড়েছে। যার ২৫০টির বাদী নারী আর ১৭৮টির পুরুষ। অভিযোগের ৯০ ভাগই পারিবারিক বিরোধে মীমাংসা করতে স্বামী-স্ত্রীর লড়াই। পর্যালোচনায় ৯০ ভাগ পুরুষ ভুল শুধরিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখাতে চাইলেও নারীদের ক্ষেত্রে ৯৫ ভাগের বেশি নানা অজুহাতে কাবিনসহ আনুষঙ্গিক খরচ বুঝে নিয়ে সংসার জীবনের ইতি টানার পক্ষে। বিচ্ছেদ চাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষদের কাবিন ৫ লাখ টাকার নিচে হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ১০ লাখ টাকার উপরে। মাত্রাতিরিক্ত দেনমোহরের ফলে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে তালাক দেয়ার প্রবণতার উদ্বিগ্নতা বাড়ছে।
লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতায় গত ৯ মাসে বিকল্পভাবে প্রায় ৬২ লাখ টাকা দেনমোহর আদায় করেছে বলে জানা যায়। এ ছাড়াও চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত দেনমোহর ও খোরপোষ দাবিতে ফেনীর পারিবারিক আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৮টি। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৩৬টি। এদিকে ৬০০টির অধিক মামলা নিষ্পত্তির পরও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে চলমান এক হাজার ৭৬০টি মামলা। যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই যৌতুকের মামলা। এসব মামলার আসল উদ্দেশ্য কাবিনের দেনমোহরের টাকা আদায় বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, আইনের সংস্পর্শে আসা এ সকল ঘটনার কয়েকগুন বেশি স্থানীয় বিভিন্ন মাধ্যমে মীমাংসা হয়। আর সে সকল ঘটনায় আদায়কৃত কাবিনের টাকা বেশিরভাগেরই প্রভাবশালী মহলের দ্বারা নয় ছয় হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ জনপ্রতিনিধি ও আলেম সমাজের।
শুধু আইন দিয়ে নয়, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে হবে বলে মনে করছেন ফেনীর পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট হাফেজ আহম্মদ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবাসী রহিম আলী (ছদ্মনাম) জানান, স্ত্রীর যৌতুক মামলায় জেলে গিয়ে দেখি সেখানে যারা এসব মামলায় আমার মতো জেল খাটছে তারা বেশিরভাগই নির্দোষ। মূলত: লাখ লাখ টাকা কাবিন করার কারণে আমরা পুরুষরা ফেঁসে যাচ্ছি।
জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছর জেলায় ১২ হাজার ৬৪৯টি নিবন্ধিত বিয়ের মধ্যে ৪৭২টি তালাকের ঘটনার তথ্য রয়েছে।
