জাতীয় ডেস্ক :
দেশে সাহিত্যের মান নিয়ে কথা হয়ে আসছিল বহুদিন ধরে। এবার মানের সঙ্গে মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে ২০২৩ সালের বইমেলায় আদৌ বই ছাপানো যাবে কি-না এমন বিষয়। মূলত কাগজ সংকট ও কাগজের দাম অত্যাধিক বেড়ে যাওয়ায় দিনকে দিন মুখ থুবড়ে পড়ছে প্রকাশনা শিল্প।
প্রকাশকদের দুরবস্থা উপলব্ধি করতে শাহবাগের আজিজ মার্কেটের নিচ তলায় একবার চোখ বুলানোই যথেষ্ট। কয়েক বছর আগেও আজিজ মার্কেটের নিচ তলার প্রথম সারিতে সবকটি ছিল প্রকশনা সংস্থা ও বইয়ের দোকান। কিন্তু দোকান ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ও বাজারে বইয়ের কাটতি কমে যাওয়ায় দিনকে দিন আজিজ মার্কেট থেকে প্রকাশনীগুলো উঠে যাচ্ছে, বইয়ের জায়গা দখল করে নিচ্ছে টি-শার্ট ও থ্রি-পিসের দোকান।
যারা আজিজ মার্কেটে দোকান ভাড়া সামাল দিয়ে ব্যবসা চালাতে পারছিল না, তাদের সিংহভাগ মাথা গুঁজেছে কাঁটাবনের কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্সের বেসমেন্টে।
প্রকাশকরা বলছেন, প্রকাশনা শিল্পের যে হাল তাতে করে এখানে ক’দিন টেকা যাবে তা নিয়ে সন্দিহান তারা।
চলমান কাগজ সংকট নিয়ে সময় সংবাদের সঙ্গে কথা হয় কাঁটাবনের কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে। এদের মধ্যে কাঁটাবন পাবলিশার্স ফোরামের সভাপতি ও সমগ্র প্রকাশনীর প্রকাশক শওকত আলি তারা বলেন, ‘আমি ঠিক করেছি সামনের বইমেলায় আর কোনো বই বের করব না। আমি সামনের বইমেলায় যাচ্ছি না।’
কেন এই সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে শওকত আলি তারা বলেন, ‘ক’দিনের ব্যবধানে রিমপ্রতি কাগজের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সবাই বলছে সংকট, আমরা তা মনে করি না। দেশে পর্যাপ্ত কাগজ আছে ও কিছু সিন্ডিকেট এটাকে মজুত করে পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে। দেশের কাগজশিল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। আর শুধু কাগজ কেন, বই ছাপানোর প্রিন্টের খরচ, প্লেটের খরচ ও বাইন্ডিং খরচও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এত সব করে যদি বই ছাপাই তাহলে ১৫০ টাকার বইয়ের দাম হবে ৩০০ টাকার ওপরে। পাঠক অত দামে বই কিনবে না।’
দেশের কাগজ সংকট ও প্রকাশনা শিল্প নিয়ে তারা বলেন, ‘আমরা যারা প্রকাশক তারা অনেকটা শখ ও রুচির জায়গা থেকে এ ব্যবসা করে থাকি। আমি যদি এখানে প্রকাশনী না দিয়ে একটি জুতার দোকান দিতাম সেটি অনেক লাভজনক হতো। আগে যে আমাদের খুব লাভ হতো এমন না। কোনো রকমে টিকে থাকা যেত। এবার সে অবস্থাও নেই। বই মেলায় স্টলের ভাড়া, কর্মী খরচ ও পাঠকের চাহিদা এখন খাপ খাইছে না। কোনোভাবেই খরচ উঠবে না। ধরে নিলাম, বই মেলায় আমি দেড় লাখ টাকার মতো বই বিক্রি করলাম। বই বিক্রির হিসাবে এটা অনেক বড় অঙ্ক। কিন্তু কর্মীদের বেতন, কাগজের দাম, লেখকের রয়ালিটি দিয়ে আমাদের কী থাকে একবার ভাবুন। এজন্যই ঠিক করেছি আগামীবার আর বইমেলায় যাব না।’
বইমেলা নিয়ে নিজের ভাবনা ও প্রস্তুতির কথা বলতে গিয়ে আপন প্রকাশের প্রকাশক হুমায়ুন রহমান সময় সংবাদকে বলেন, ‘কাগজ যেমন একটা সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি, একইভাবে বইমেলাও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। বছর বছর স্টলের ভাড়া বাড়ানো হয়। আগে আমরা ডাবল স্টল নিতাম ১৭ হাজার টাকায়, গতবার তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। ট্রিপল স্টলের ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৬২ হাজার টাকা। সবাই বলছে কাগজ সংকট, কিন্তু টাকা বেশি দিলে কাগজ পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে কিন্ত কাগজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ধান্ধাবাজি টের পাওয়া যাচ্ছে। আগে এক রিম কাগজ কিনতাম ২ হাজার ২০০ টাকায়, এখন যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। কাগজতো কাগজ, বইয়ের মলাটের বোর্ডের দাম ছিল আগে বক্সপ্রতি ৫০০ টাকা, এখন ১ হাজার ২০০ টাকা।’
প্রকাশকরা তাদের সমস্যার কথা সরকার কিংবা সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছেন কি-না জানতে চাইলে হুমায়ুন রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রকাশনা ব্যবসা আসলে একচেটিয়া হয়ে গেছে। সংগঠনের হোতারা আমাদের মতো গরিব প্রকাশকদের কথা বলে না, নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত তারা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এ ব্যবসা আর টিকিয়ে রাখা যাবে বলে মনে হচ্ছে না।’
সাহস প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী নাজমুল হুদা রতন বলেন, ‘কাগজের এ সংকট কৃত্রিম। যেভাবে সিন্ডিকেট করে একেকবার একেক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়, এবারও সে নিয়মে কাগজের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশে ৩০০টির মতো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে দশটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও ভালো না। এখানে আপনি সবকিছুর নির্দিষ্ট একটি বাজার পাবেন, বইয়ের কিন্তু এ রকম কোনো বাজার নেই। কেউ যদি চিন্তা করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে রুজিরুটি কামাবে, তাহলে তাকে এক রকমে না খেয়ে থাকতে হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কয়েক দিনের ব্যবধানে রিমপ্রতি কাগজের দাম বেড়ে গেছে ১ হাজার ২০০ টাকা। অনেকে আগাম অর্ডার দিয়েও কাগজ পাচ্ছেন না। এদিকে কাগজের দাম বাড়ায় ফর্মা হিসাবে বইয়ের দামও বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছেন প্রকাশকরা। একদিকে বাজারে খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে এভাবে বইয়ের দাম বাড়ালে ক্রেতারা আদৌ বই কিনবে কি-না এ নিয়ে সন্দিহান প্রকাশকরা।
