রিপন হোসেন সাজু, মনিরামপুর (যশোর) :
আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়, পৃথিবীতে বেঁচে থেকে সকল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এই বার্তা পৌঁছে দিতে গতকাল শুক্রবার সকালে বাইসাইকেল চালিয়ে যশোরের মণিরামপুর থেকে যাত্রা শুরু করেছেন ভারতের যুবক সঞ্জয় বিশ্বাস (৩৩)। ভারতের ২৪ টি রাজ্যে এ বার্তা পৌঁছে দিয়ে গত সোমবার তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। করোনাকালীন সময়ে সঞ্জয় রেস্টুরেন্টের ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার মত জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্ত নিয়ে সেখান থেকে ফিরে আসেন। এবং উপলব্ধী করেন, সগ্রাম করে বেচে থাকার নামই জীবন। সঞ্জয় ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার গাইঘাটা থানার গুটরী গ্রামের সুমন্ত বিশ্বাসের ছোট ছেলে।
সঞ্জয় বিশ্বাস জানান, ভারতের উত্তর প্রদেশের আমেথি জেলা সদরে তার রেস্টুরেন্টের ব্যবসা ছিল। ব্যবসা ভালোই চলছিল। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে তার ব্যবসায় মন্দা যায়। একের পর এক লোকশান গুনতে গুনতে এক পর্যায়ে তিনি রেস্টুরেন্টের ব্যবসা বন্ধ করে মানষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মানষিক ডিপ্রেশন থেকে সঞ্জয় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কিন্তু বিভিন্ন কারনে সে দুইবার চেষ্টা করেও আত্মহত্যা করতে পারেনি। সুস্থ হয়ে সঞ্জয় উপলব্ধি করেন, “আত্মহত্যা যন্ত্রণার শেষ করেনা, এটি অন্য কাউকে দিয়ে দেয়। জীবনের একমাত্র অর্থ মানবতার সেবা করা।” আর তাই ২০২১ সালের ৩০ আগষ্ট সঞ্জয় তার জীবন থেকে নেয়া এই শিক্ষা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে রাস্তয় নেমে পড়েন। একটি বাইসাইকেল নিয়ে তার পিছনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে তার উপলব্ধির কথা একে একে ভারতের ২৪ টি রাজ্যের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছন। ২৪ টি রাজ্য ঘুরে চলতি বছরের ১৪ মে সঞ্জয় বাড়ি ফিরে আসেন। এতে তার সময় লাগে ৮ মাস ১৫ দিন। ভারতের পর তার এই বার্তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গত সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বাইসাইকেল চালিয়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মণিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়া ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামে দুঃসম্পর্কের এক কাকার বাড়িতে আশ্রয় নেন। গতকাল শুক্রবার থেকে তিনি বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলায় তার এই বার্তা পৌঁছে দিতে যাত্রা শুরু করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে সঞ্জয় বলেন, “আত্মহত্যা বন্ধ করতে পারব কিনা জানিনা, তবে আশা করি আমার এই বার্তা কিছু মানুষের উপকারে আসবে।” এ বিষয়ে জানতে চাইলে মণিরামপুর কুয়াদা স্কুল এন্ড কলেজের যুক্তিবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক প্রজিৎ কুমার মন্ডল বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা রাতারাতি তৈরি হয়না। এটি অনেকদিন ধরে মানুষের ভেতরে থাকে। বারবার কোন ব্যর্থতায় নিজেকে মেরে ফেলতে চাওয়া মানুষ একসময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। জীবনের অপর নাম সংগ্রাম। আত্মহত্যায় কোন কিছুর সমাধান নয়। মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, প্রতিবছর মানুষিক হতাশার কারনে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। জীবনটা এক অমূল্য সম্পদ, শ্রষ্ঠার অমূল্য দান। মানুষকে জীবনের মূল্যটা বুঝতে হবে। কিছু সময় খারাপ আসতেই পারে। কিন্তু সেটাকে প্রতিকুল পরিস্থিতি, নিজের মেধা যোগ্যতা এবং পারস্পরিক অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে অতিক্রম করতে হবে। আমরা এই অনাকাঙ্খিত মৃত্যু দেখতে চাইনা। প্রত্যেকের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা এবং তার যে স্বাভাবিক শক্তি সেটিকে কাজে লাগিয়ে সে সমাজে প্রতিষ্টা পাবে, মর্যদা ইজ্জতের জাইগায় যাবে, এটিই আমাদের প্রাপ্য। এই ধরণের যারা ডিপ্রেশনে ভোগে তাদের পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহানুভূতি দরকার।
সঞ্জয় ব্যবসায়িক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্ত নিয়ে সেখান থেকে ফিরে এসেছেন। এখন তিনি মানুষকে সচেতন করার জন্য নিজের দেশ থেকে শুরু করে পার্শ্ববর্তী দেশে চলে এসেছেন। এই সচেতনতাটা যেন আমাদের যুব সমাজ কাজে লাগাতে পারে। যারা মানুষিক ডিপ্রেশনে ভুগছে, তাদের জন্য এটা একটা অনুপ্রেরণা হতে পারে। তার এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিকূলতা আমি তেমন দেখছিনা। আশাকরছি বাংলাদেশের যে প্রান্তেই সে যাক, প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ জনগন তাকে সহযোগীতা করবে।
