জাতীয় ডেস্ক :
সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে নড়াইলে মধুমতী নদীর ভাঙন। গত ১৫ দিনে শালনগর ইউনিয়নের মন্ডলভাগ গ্রামের একশোর কাছাকাছি বাড়িঘর স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শালনগর ছাড়াও জয়পুর, লোহাগড়া, কোটাকোলসহ অন্তত ছয় ইউনিয়নব্যাপী কয়েক দশকের অব্যাহত ভাঙনে সব হারানো মানুষের মিছিল দিন দিন দীর্ঘতর হচ্ছে। ভাঙন পীড়িতদের সহায়তা প্রদান অব্যাহত রয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন ভাঙন ত্বরান্বিত করছে দাবি করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ভাঙন ঠেকাতে ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, সর্বগ্রাসী নদী ভাঙনের দৃশ্য মধুমতী তীরবর্তী লোহাগড়া উপজেলাবাসীর কাছে খুবই চেনা। বর্ষা এলেই খরস্রোতা হয়ে ওঠে মধুমতী। তীব্র ভাঙন জনবসতি, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, স্থাপনা একের পর এক গ্রাস করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় এবছর বর্ষায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ডলভাগ গ্রামের ভাঙন পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। এ গ্রামের অন্তত দেড় কিলোমিটারব্যাপী ভাঙন তীব্র হয়ে উঠে। এতে বাড়িঘর, ফসলি জমি, গাছপালা, পাকা রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্রমাগত নদীতে বিলীন হচ্ছে। ভাঙন প্রতিদিনই নতুন নতুন বসতি গ্রাস করায় ভাঙন আতঙ্কে স্থানীয়দের নির্ঘুম রাত কাটছে বলেও তারা জানান।
সরেজমিন দেখা গেছে, নদী তীরবর্তী ব্যাপক অংশ জুড়ে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটল অংশ স্রোতের তোড়ে নদীতে ভেঙে পড়ছে। অনেকে বাড়িঘর স্থাপনা সরিয়ে নিয়ে ক্ষতি কিছুটা পোষানোর চেষ্টা করছেন। আগ্রাসী ভাঙন এতটাই তীব্র যে মানুষের বাড়িঘর সরিয়ে নেয়ার সময়টুকুও যেন দিতে নারাজ।
ভাঙনে নিঃস্ব মন্ডলভাগ গ্রামের সবুর মোল্যা (৬৫) জানান, তিন তিনবার ভিটেমাটি সহায়সম্বল নদীতে ভেঙে গেছে। জায়গা জমি আর অবশিষ্ট নেই। জমি কিনে বসতি গড়ারও আর সামর্থ্য নেই। তাই পরের জায়গায় কুঁড়েঘর তুলে কোনো রকমে দিন কাটছে। এ পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ সবুর মোল্যার।
একই গ্রামের আরিফ শেখের স্ত্রী কহিনুর বেগম (৫০) কান্নাজড়িত কণ্ঠে সময় সংবাদকে বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে সারা জীবনের তিল তিল করে জমানো অর্থে বাড়িঘর করেছিলাম। এখন ভেঙে ফেলতে হচ্ছে, এরপরে কোথায় যাব জানি না।
সবুর মোল্যা, কহিনুর বেগম, বৃদ্ধ অতিয়ার রহমান, স্বামী হারা বৃদ্ধা আলেয়া বেগম, নূর মোহাম্মদ মোল্যার মতো মধুমতীর রুদ্র রোষে সহায় সম্বল হারিয়ে মন্ডলবাগ গ্রামের অনেকেই আজ দিশাহীন।
শালনগর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড সদস্য একই গ্রামের এনায়েন হোসেন খান অভিযোগ করেন, গত পনের দিনে মন্ডলভাগ গ্রামের একশোর কাছাকাছি বাড়িঘর স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন যাবত ভাঙনের কবলে এ গ্রামের বহু মানুষ সহায় সম্বল হারিয়ে পথে বসলেও এ পর্যন্ত এখানে কোনো সরকারি সহায়তা পৌঁছেনি। তিনি অবিলম্বে অসহায় জনসাধারণকে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি ভাঙন রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।
লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আজগার আলী জানান, লোহাগড়ার মধুমতী তীরবর্তী শালনগর, জয়পুর, কোটাকোল, মল্লিকপুর, ইতনা ও লোহাগড়া ইউনিয়ন মূলত ভাঙনপ্রবণ। এসব ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন যাবত নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পুনর্বাসন সহায়তার আওতায় নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার ব্যবস্থাপনায় ২০২১/২২ অর্থবছরে এই ৬টি ইউনিয়নে ভাঙন পীড়িত ৪৩২ জনকে জনপ্রতি ১০ হাজার ৪০০ টাকা করে মোট ৪৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এ মৌসুমে মন্ডলভাগসহ কয়েকটি স্থানে ভাঙনের তীব্রতার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে। এসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সরকারি নানা সহায়তা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড, নড়াইল পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ (পওর) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন নদী ভাঙনের কারণ হিসেবে শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলনের পাশাপাশি বর্ষায় পানি বৃদ্ধিকে দায়ী করেন। তিনি জানান, গেল অর্থ বছরে লোহাগড়া উপজেলার ভাঙন কবলিত বিভিন্ন স্থানে প্রায় এক হাজার ৪০০ মিটার স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া তিন হাজার ৫৯০ মিটার কাজ চলমান রয়েছে। এর বাইরে বর্তমানে ভাঙনপ্রবণ মন্ডলভাগসহ কয়েকটি পয়েন্টে ৬৫০মিটার নদীতীর রক্ষায় অস্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
