জাতীয় ডেস্ক :
শরীয়তপুরে স্কুলে গিয়ে সবার সামনে প্রেমিকের মা-ভাইয়ের অপমান ও বিদ্যালয় থেকে টিসি দেয়ায় ফাঁস দিয়ে স্কুলছাত্রী সুরভীর আত্মহত্যার ঘটনায় বিক্ষোভ করেছে তার পরিবার-সহপাঠীরা।
রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি। পরে বিক্ষোভকারীরা বিদ্যালয় মাঠে একত্রিত হয়ে দোষীদের বিচার দাবি জানান।
শরীয়তপুর সদর-গোসাইরহাট সড়কের সুবচনি বাজারে টায়ার ও কাঠ জ্বালিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে সুরভীর পরিবার, বিদ্যালয়ের বর্তমান-সাবেক শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। এসময় সড়কের উভয় পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মেয়ের মা, বাবা, চাচা, বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান, সজিব সরদার, শামীম কাজী ও বর্তমান শিক্ষার্থী আয়শা নূর , সাথী আক্তার, লাইজু, বৈশাখীসহ সহস্রাধিক মানুষ।
পুলিশ, বিক্ষোভকারী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়নের সোনামুখী গ্রামের ছেলে আল আমিন তালুকদার (১৬) এবং চরলক্ষ্মীপুর গ্রামের সুরভী আক্তার (১৬) স্থানীয় সুবচনী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। একই বিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে এক বছর ধরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে কিছুদিন আগে ছেলেটিকে তার পরিবার ঢাকা নিয়ে যায়। কিন্তু এরপরও তাদের যোগাযোগ চলতে থাকে।
প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকালে মেয়েটি স্কুলে যায়। ছেলের মা পারভীন বেগম (৫০) ও বড় ভাই পারভেজ তালুকদার (৩২) হঠাৎ স্কুলে গিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের সামনে তাকে গালিগালাজ ও জুতাপেটা করেন। এ সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন পক্ষপাতিত্ব হয়ে ওই ছাত্রীকে তাৎক্ষণিক টিসি দিয়ে দেন এবং মৌখিকভাবে বলে দেন আগামী দুই বছর তুই কোথাও ভর্তি হতে পারবি না তোর লেখাপড়া শেষ। অপমানের বিষয়টি বেশি কষ্টদায়ক হয়ে পড়লে এক পর্যায়ে সুরভী অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় শিক্ষার্থীরা তার মাথায় পানি ঢেলে কিছুটা সুস্থ করেন।
এক পর্যায়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দপ্তরিকে ডেকে সুরভীকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে বলেন। বাড়ি পৌঁছালে সুরভীর মা দপ্তরিকে কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে কিছু হয়নি এমন উত্তর দেয় স্কুল দপ্তরি। মেয়েকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই দুপুরের দিকে সে ঘরের একটি কক্ষ বন্ধ করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এ ঘটনায় শুক্রবার মেয়ের বাবা জাহাঙ্গীর ওঝা বাদী হয়ে চারজনকে আসামি করে পালং মডেল থানায় একটি মামলা করেন।
মামলার আসামি প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন, প্রেমিক আল আমিন, তার ভাই পারভেজ ও মা পারভীন। ঘটনার পর পরই প্রধান শিক্ষকসহ আল আমিন পরিবারের সবাই পালিয়েছেন। তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা বলেন, এ মৃত্যু মেনে নেয়ার মতো নয়। মেধাবী ছাত্রী সুরভীকে অপমান ও টিসি দিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকসহ দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ফাঁসি দিতে হবে। তানা হলে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।
স্কুলছাত্রীর মা ডলি বেগম ও বাবা জাহাঙ্গীর ওঝা কান্না কণ্ঠে বলেন, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদের সামনে ওই ছেলের মা ও ভাই আমার মেয়েকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে। আবার জুতা দিয়ে পিটিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে প্রধান শিক্ষক মেয়েকে টিসি দিয়ে দেয়। সুরভী যেন দুই বছরের মধ্যে কোনো বিদ্যালয়ে যেন ভর্তি হতে না পারে। মেয়ে এ অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। আমাদের মেয়েকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করানো হয়েছে। আমরা দোষীদের ফাঁসি চাই।
রুদ্রকর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম ঢালী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি চাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
শরীয়তপুর সদরের পালং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেন বলেন, এমনিতে শিক্ষার্থীদের মনেক্ষোভ কারণ তারা সহপাঠীকে হারিয়েছে। তবুও বিক্ষোভকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, এ ঘটনায় চারজনকে আসামি করে একটি মামলা হয়েছে। মামলার আসামিরা ঘটনার পর গা ঢাকা দিয়েছেন। যত দ্রুত সম্ভব আমরা আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।
