হোম আন্তর্জাতিক শ্রীলঙ্কা: সিঙ্গাপুর থেকে সোমালিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

শ্রীলঙ্কা একসময় দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল। অর্থনীতি, শিক্ষা ও জীবনযাপনের মান উন্নত ছিল। মধ্যম আয়ে থাকা এ দেশটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতিতে পড়েছে।

একসময় অনেকে বিশ্বাস করতেন, এশিয়ার সবচেয়ে আশ্চর্যপূর্ণ দেশ শ্রীলঙ্কা। অনেকে ভাবত, শ্রীলঙ্কা সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে। কিন্তু হায়! দেশটি এখন ব্যর্থ রাষ্ট্র সোমালিয়ায় পরিণত হয়েছে।

দেশটিতে খাবার নেই, ওষুধ নেই, জ্বালানি নেই, বিদ্যুৎ নেই এমনকি শিশুখাদ্যও নেই। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট দ্বীপরাষ্ট্রটিকে দেউলিয়া করে ফেলেছে। আশির দশকে শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের সময়ও এমন নাজুক অবস্থায় পড়তে হয়নি।

মানুষ জ্বালানি, রান্নার গ্যাস, এমনকি চিনি, ময়দা ও গুঁড়ো দুধের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। ফিলিং স্টেশনে লাইনে অপেক্ষা করতে গিয়ে দুই প্রবীণ নাগরিকের মৃত্যুও হয়েছে।

শুধু তাই নয়, পাঠসামগ্রী বই-খাতারও সংকট দেখা দেয় দেশটিতে। খাতা ও প্রশ্নপত্র সরবরাহে ব্যর্থ হয়ে দেশটিতে পরীক্ষাও বাতিল করা হয়। শ্রীলঙ্কার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য আইল্যান্ড (ইংরেজি) ও দিভাইনা (সিংহলি) তাদের ছাপা সংস্করণ বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া অন্যান্য দৈনিক পত্রিকাগুলো তাদের সার্কুলেশন কমিয়ে ফেলে।

শ্রীলঙ্কার সংকট প্রকট হওয়ার আগেই ২০১৯ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) একটি ওয়ার্কিং পেপারে বলা হয়, শ্রীলঙ্কার জাতীয় ব্যয় তার জাতীয় আয়ের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া দেশটিতে পরিষেবা ও বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদন অপর্যাপ্ত।

২০১৯ সালে দেশটিতে মাহিন্দা রাজাপাকসে সরকার কর কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। এরপর শুরু হয় করোনা মহামারি। সরকারের সেই সিদ্ধান্ত ও মহামারির কবলে পড়ে শ্রীলঙ্কা অর্থনীতিতে ব্যাপক বিপর্যস্ত হয়।

শ্রীলঙ্কার লাভজনক ব্যবসা হলো পর্যটন শিল্প। করোনার কারণে সেই ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়ে। একই সময় প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্সও কমে যায়। একসময় দেশটির আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজার ধস নামে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ধারণা অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭০ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে তেলের ঊর্ধ্বমূল্যও দেশটিকে কাবু করে।

শ্রীলঙ্কায় দুই কোটি মানুষের বাস। এর মধ্যে ৫০ লাখ নিম্ন আয়ের মানুষ ছিল। করোনার সময় দেশটির উত্তরাঞ্চল থেকে নিম্ন আয়ের অনেকে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন।

এরকম পরিস্থিতিতে ২০২১ সালে রাজাপাকসে সরকার রাসায়নিক সার নিষিদ্ধ করে। এ সিদ্ধান্তের ফলে শ্রীলঙ্কার কৃষি খাতও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রুপি ছাপিয়েছে এবং ফলস্বরূপ ফেব্রুয়ারিতে আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। এই মুদ্রাস্ফীতি শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে আরও পঙ্গু করে দিয়েছে।

শুধু বৈদেশিক ঋণ মোকাবিলা করার জন্য শ্রীলঙ্কার এ বছর ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন। যদিও দেশের বর্তমান বৈদেশিক রিজার্ভ মাত্র ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এই মুদ্রা সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দ্বীপরাষ্ট্রটি ভারত, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, চীন এমনকি বাংলাদেশেরও দ্বারস্থ হয়েছে।

আবার নজিরবিহীন এই আর্থিক সংকট পেছনে বৈদেশিক ঋণ নেওয়াকেও দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। আগের ঋণেই যখন শ্রীলঙ্কা জর্জরিত, তখন নতুন আরও ঋণের বোঝা নিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে দেশটিকে রাজনৈতিক সংকটও মারাত্মক আঘাত করেছে। দেশটির জনগণ রাজাপাকসে পরিবারের নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে বাঁচতে পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে সরকারি বাসভবন ছেড়ে পালিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেরও পতন চায় তারা।

শ্রীলঙ্কা কীভাবে বর্তমান অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠবে, তা নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার ওপর। রাজনৈতিক ও ঋণের দুষ্ট চক্রের ধকল তিনি কাটিয়ে উঠবেন নাকি পদ ছেড়ে দেবেন— আপাতত সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন