হোম ফিচার শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবসে আলোচনা সাতক্ষীরার সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বধ্যভূমিতে মোমবাতি প্রজ্জ্বালনে শহীদদের স্মরণ করলেন নাগরিক নেতৃবৃন্দ বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণে আল্টিমেটাম

 

নিজস্ব প্রতিনিধি :

আগামি ২৫ মার্চের গণহত্যা দিবসের আগেই সাতক্ষীরা শহরের আমতলা মোড়ে দীনেশ কর্মকারের বসত ভিটার গণকবরটি সংরক্ষণ করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের আল্টিমেটাম দিয়ে সাতক্ষীরার নাগরিক সমাজ জেলা প্রশাসক ও সাতক্ষীরার জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

স্মারকলিপি দিয়ে এরই মধ্যে বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে নাগরিক নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই কাজ শুরু করা হবে। এতে ব্যত্যয় ঘটলে গণঅনশন সহ নানাবিধ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

নাগরিক নেতৃবৃন্দ বলেছেন, এর আগেও এই স্থানে দাঁড়িয়ে জনপ্রতিনিধিরা স্মৃতিসৌধ নির্মাণে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আজও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সোচ্চার হবার আহবান জানান।

বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার বিকালে সাতক্ষীরার আমতলা মোড়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের প্রান্তে আয়োজিত মোমবাতি প্রজ্জ্বালন ও আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেছেন নাগরিক নেতৃবৃন্দ। তারা সোচ্চার কন্ঠে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পার হবার পরও এই স্থানটি ছাড়াও সাতক্ষীরার অনেক এলাকার গণকবর ও বধ্যভ‚মি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এগুলি সংরক্ষণ করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সুভাষ সরকারের সভাপতিত্বে মোমবাতি প্রজ্জ্বালন ও আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আবু আহমেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. নুরুল আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. সুশান্ত ঘোষ জাসদ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার কাজেম আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা বিএম রাজ্জাক, অ্যাড. ওসমান গনি, ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. ফাহিমুল হক কিসলু, নাগরিক নেতা উন্নয়নকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত, জাসদ সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইদ্রিস আলী, জেলা আওয়ামী লীগ নেত্রী লায়লা পারভিন সেঁজুতি, সাংবাদিক সুভাষ চৌধুরী, সাংবাদিক শরীফুল্লাহ্ কায়সার সুমন, সাংবাদিক রঘুনাথ খাঁ, সাংবাদিক আমিনা বিলকিস ময়না, কবি মন্ময় মনির, কবি গাজী শাজাহান সিরাজ, কবি ও শিক্ষক আব্দুল মোমিন, কবি নাজিমুদ্দিন বিশ^াস, কৃষকলীগের মঞ্জুর আহমেদ, বাসদের এ্যাড. খগেন্দ্রনাথ দাস, এ্যাড. আবুল কালাম আজাদ, গণফোরামের আলী নূর খান বাবুল, জেলা মহিলা পরিষদের সম্পাদক জোৎস্না দত্ত, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মুনসুর রহমান প্রমূখ।

বক্তারা বলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে নেমেছিলাম। এর ফসল হিসেবে আমরা নিয়ে এসেছি একটি স্বাধীন ভ‚খন্ড, একটি লালসবুজ পতাকা। অপরদিকে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী এদেশের তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের সহায়তা নিয়ে অগনিত বাঙালি হত্যায় মত্ত হয়ে ওঠে। তারা নয় মাসের গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে। সেই রক্তের একাংশ রয়েছে সাতক্ষীরার এই পূন্য মাটিতে।

সে সময়ের প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ দিয়ে আলোচকরা বলেন, একাত্তরের ১৯ এপ্রিল বৃষ্টির কারনে ভারতগামী অগনিত সংখ্যক হিন্দু নারীপুরুষ তৎকালীন টাউন স্কুলে (বর্তমানে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) আশ্রয় গ্রহণ করে। ২০ তারিখ তাদেরকে রাজাকার আলবদররা পাকিস্তানিদের সহায়তায় বের করে এনে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং ধারালো বটি ও দা দিয়ে জবাই করে হত্যার পর লাশ ফেলে দিয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পর এই বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক মাহবুবুর রহমান ও জামায়াত আলী তাদেরকে মাটিচাপা দিয়ে সমাহিত করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা দিয়ে বক্তারা বলেন, অর্ধমৃত মানুষকেও ঘাতকরা দীনেশ কর্মকারের বাস্তুভিটায় গর্ত করে যখন চাপা দিচ্ছিল তখনও নিচ থেকে তাদের কান্নার স্বর ভেসে আসছিল। রাজাকারদের হাতে প্রাণ হারানো এসব মানুষ ছিলেন খুলনা, বরিশাল ও ফরিদপুর অ লের। তারা ছিলেন ভারতগামী শরণার্থী।

গণহত্যার এই দিনটিকে স্মরণ করে নাগরিক নেতৃবৃন্দ বলেন, এখন পর্যন্ত সেসব পরিবারের কান্না থামেনি। তারা স্বজনদের এখনও খুঁজে বেড়ায়। আমাদের দায়িত্ব রয়েছে তাদের গণকবর সংরক্ষণ করে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরী করা যাতে মানুষ তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার সুযোগ পায়। একই সাথে নতুন প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকবাহিনী ও রাজাকারদের নির্মম বর্বরতার পৈশাচিক বিষয়টি মনে রাখতে পারে।

প্রত্যেক নাগরিক মোববাতি হাতে নিয়ে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বলেন, যেকোন মুল্যে আমরা এখানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করবোই। জেলার অন্যান্য স্থানেও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করানো হবে। পরে প্রজ্জ্বালিত মোমবাতি প্রাচীরের ওপর ওপর সারিবব্ধভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়।

 

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন