হোম আন্তর্জাতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হলেও ট্রাম্প আর মোদির ভাষ্যে ‘ফারাক’

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হলেও ট্রাম্প আর মোদির ভাষ্যে ‘ফারাক’

কর্তৃক Editor
০ মন্তব্য 37 ভিউজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হওয়ার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত থেকে আসা পণ্যের উপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করবে।

ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একটি পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন যে, ভারত বাণিজ্য বাধা শূন্যে নামিয়ে আনবে এবং রাশিয়ান তেল কেনাও বন্ধ করবে।

রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে দিল্লির অস্বীকৃতির জন্য আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কও প্রত্যাহার করা হবে।

প্রায় দুই দশক ধরে চলমান আলোচনার অবসান ঘটিয়ে ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি যুগান্তকারী বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা করার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই ঘোষণাটি এলো।

এর আগে, সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া একটি পোস্টে চুক্তির বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীও। মোদি বলেছেন, আমেরিকার সঙ্গে একটি চুক্তি হওয়ায় তিনি ‘আনন্দি’।

এদিকে, নিজের পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সকালের ফোনালাপে বাণিজ্য এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন, তিনি রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভবত ভেনেজুয়েলা থেকে আরও অনেক তেল কিনতে সম্মত হয়েছেন।

ট্রাম্প আরও বলেন, মোদির অনুরোধে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ‘একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হয়েছে’ যার মাধ্যমে শুল্ক কমানো হবে এবং ভারতের শুল্ক এবং অ-শুল্ক বাধা শূন্যে নেমে আসবে।

ট্রাম্প বলেন, ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের আমেরিকান পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মোদি, যার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি এবং কয়লাজাত পণ্য।

তবে, দুই জনেই চুক্তির সম্মত হওয়ার কথা জানালেও, ডোনাল্ড ট্রাম্প আর নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যে বেশকিছু পার্থক্যও সামনে ধরা পড়েছে।

ট্রাম্প আর মোদীর ভাষ্যে ‘ফারাক’

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পোস্টের কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘আমার প্রিয় বন্ধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে খুবই আনন্দিত। এটা জেনে খুব খুশি হয়েছি যে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’র অধীনে উৎপাদিত পণ্যের ওপরে এখন ১৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এই দারুণ ঘোষণার জন্য ভারতে ১৪০ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনেক-অনেক ধন্যবাদ।’

তিনি আরও যোগ করেন, যখন দুটি বৃহৎ অর্থনীতি এবং বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র একসাথে কাজ করে, তখন এটি আমাদের জনগণের উন্নয়ন করে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য প্রচুর সুযোগ তৈরি করে।

প্রসঙ্গত, ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ হলো ভারত সরকারের একটি বিশেষ প্রকল্প, যাতে দেশীয় পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান করা হয় নানা ভাবে।

তবে ট্রাম্প যে বলেছেন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে ভারত, মোদির পোস্টে এর উল্লেখ নেই।

আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপরে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনা হবে, নরেন্দ্র মোদীর পোস্টে এটারও উল্লেখ নেই।

ট্রাম্প লিখেছেন যে ভারত আমেরিকার কাছ থেকে ৫০০ কোটি ডলার মূল্যে পণ্য কিনবে, তবে ভারতের তরফ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি।

দক্ষিণ এশিয়ার বৈশ্বিক রাজনীতির ওপরে নজর রাখা বিশ্লেষক মাইকেল কুগলম্যান এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প দাবি করছেন যে মোদী রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার ব্যাপারে সহমত হয়েছেন। আমার এই ব্যাপারে সন্দেহ আছে।’

কুগলম্যান লিখেছেন, যদিও নভেম্বরে রাশিয়ার ওপরে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পরে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে। আমেরিকার সাথে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে এখনো অনেক বিষয়ই স্পষ্ট নয়। ভারত কি কৃষির মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দেবে? আগে কোনো সমঝোতা না হওয়ার পেছনে তো এটাই একটি বড় কারণ ছিল।

ট্রাম্প যে দাবি করেছেন যে ভারত ৫০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আমেরিকা থেকে আমদানি করবে, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২০২৪ সালে ছিল ২১২ কোটি ডলার।

আগস্ট মাসে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর থেকেই আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে – যা এশিয়ার কোনো দেশের জন্য সর্বোচ্চ।

এছাড়া রাশিয়ান তেল কেনার কারণে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ জরিমানাও।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে, এই চুক্তির অংশ হিসেবে রাশিয়ান তেল কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে এবং অন্যান্য শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে আনা হবে।

ট্রাম্পের শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় রপ্তানি তীব্রভাবে হ্রাস পায়। এরপর থেকেই, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সাথে লড়াইরত অন্যান্য দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্বের চেষ্টাও করছিলেন দিল্লির কর্মকর্তারা।

ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত সপ্তাহে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা করেছে। যেখানে ভারত এবং ২৭টি ইউরোপীয় রাষ্ট্রের ব্লকের মধ্যে প্রায় সমস্ত পণ্যের উপর কর কমানোর কথা জানানো হয়েছে।

এই দুই পক্ষই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মুখে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তিকে ‘দ্য মাদার অফ অল ডিলস’ বা সব চুক্তির সেরা চুক্তি বলে অভিহিত করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উর্সুলা ভন ডের লেয়ন। এই চুক্তির ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে ইইউ রপ্তানি দ্বিগুণ হবে বলেও জানানো হয়েছে।

বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস সংস্থা প্যানজিয়া পলিসির প্রতিষ্ঠাতা টেরি হেইনস ওয়াশিংটন-দিল্লি চুক্তি নিয়ে বলেছেন, ‘যারা মনে করেন যে ইইউ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াচ্ছে বা তার উপর ভর করে গতি অর্জন করছে, এটা তাদের উত্তর।’

তিনি আশা করেন অভ্যন্তরীণ মার্কিন বাজার এই চুক্তিটি নিয়ে ‘উল্লাস’ করবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৮০০ ক্ষুদ্র ব্যবসার জোট, উই পে দ্য ট্যারিফস, এই ঘোষণার সমালোচনা করে বলেছে যে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বাস্তবায়নের আগে, আমেরিকান আমদানিকারকরা ভারত থেকে আসা পণ্যের উপর গড়ে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ কর দিতেন।

‘এই ‘‘চুক্তি’’র ফলে আমরা এক বছর আগে যা কর দিচ্ছিলাম তার চেয়ে ছয় গুণ বেশি হারে কর আদায় করা হচ্ছে,’ সংগঠনের পরিচালক ড্যান অ্যান্থনি বলেন, ‘এটি স্বস্তি নয়, এটি একটি স্থায়ী কর বৃদ্ধি যা দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।’

এদিকে, ট্রুথ সোশ্যালে দিল্লির সাথে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার পর মার্কিন শেয়ারের দাম বেঁড়েছে পুঁজিবাজারে।

বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা নিয়ে ভারতের রাজনীতিবিদরা কী বলছেন

যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণার পরে ভারতের রাজনৈতিক মহল প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করেছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ মন্ত্রী তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

নরেন্দ্র মোদী এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে অমিত শাহ তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘ভারত-মার্কিন সম্পর্কের এটি একটি স্মরণীয় দিন, কারণ মাত্র ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেই বাণিজ্য চুক্তিটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এর ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক মজবুত হবে আর দুটি দেশের মধ্যে সহযোগিতার পথ পরিষ্কার হবে।’

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এখন যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘এই চুক্তি দুটি অর্থনীতিতে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে। এর ফলে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি আরও জোরদার হবে এবং কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।’

অন্যদিকে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই চুক্তি নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছে।

তারা এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছে যে পাকিস্তানের সঙ্গে গত বছরের যুদ্ধবিরতির মতোই বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণাও ট্রাম্পের দিক থেকে এসেছে এবং বলা হয়েছে যে ‘মোদীর অনুরোধে’ বাণিজ্য চুক্তি করা হচ্ছে।

তারা আরও কিছু প্রশ্ন তুলেছে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে।

তারা বলেছে, ‘ট্রাম্প বলছেন যে আমেরিকার পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক এবং অ-শুল্ক বাধাসমূহ শূন্যে নামিয়ে আনবে ভারত। অর্থাৎ আপনি আমেরিকার জন্য পুরো বাজারটাই উন্মুক্ত করে দিলেন। এর ফলে ভারতীয় শিল্পের বড়ো ক্ষতি হবে। এখানকার ব্যবসায়ী, এখানকার কৃষক – আপনি কারও পাশে দাঁড়ালেন না।’

তারা এও বলেছে, ‘আমেরিকার জন্য কৃষি খাত উন্মুক্ত করার কথা হচ্ছে, আসল চুক্তিটা কী হয়েছে? আমাদের কৃষকদের হিতের কথা মাথায় রাখা হয়েছে, না কি তাদের পাশ থেকেও সরে গেলে? আমাদের কৃষকদের সুরক্ষা কীভাবে সুনিশ্চিত করা যাবে?’

কংগ্রেস দলের প্রশ্ন, ‘বলা হচ্ছে যে মোদী রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনবেন না, আমেরিকা আর ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি করবেন। বাণিজ্য চুক্তিতে কি মোদী সরকার রাশিয়ার সঙ্গ-ত্যাগের প্রশ্নে রাজি হয়েছে?’

তারা এই দাবিও করেছে যে পুরো বিষয়টা দেশ আর সংসদের সামনে পেশ করা উচিত সরকারের।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন