হোম জাতীয় সেন্টমার্টিনে প্রতিদিন পর্যটক প্রবেশের সীমা ৯০০ জন করার প্রস্তাব

সেন্টমার্টিনে প্রতিদিন পর্যটক প্রবেশের সীমা ৯০০ জন করার প্রস্তাব

কর্তৃক Editor
০ মন্তব্য 40 ভিউজ

নিউজ ডেস্ক:

অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে সেন্টমার্টিনে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে পর্যটন কার্যক্রম মাত্র চার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯০০ জন পর্যটক প্রবেশের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রণীত খসড়া মহাপরিকল্পনায় এ প্রস্তাব করা হয়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, পর্যটক সংখ্যা নির্ধারণের আগে সেন্টমার্টিনে একসঙ্গে রাত যাপন করতেন ৭ হাজার ১৯৩ জন পর্যটক, যা দ্বীপটির ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ। অতিরিক্ত পর্যটনের ফলে প্রবাল সংগ্রহ বৃদ্ধি, নৌযান থেকে সৃষ্ট দূষণ এবং সমুদ্রসৈকতে আবর্জনার চাপ বেড়ে যায়। এর প্রভাবেই দ্বীপটির প্রবালপ্রাচীর বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

দশকের পর দশক ধরে অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন, লাগামহীন পর্যটন এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে সেন্টমার্টিনের সূক্ষ্ম বাস্তুতন্ত্র আজ ভেঙে পড়ছে। প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক হোটেল-রিসোর্ট ও অবকাঠামোর চাপে বিপন্ন হচ্ছে দ্বীপের পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা।

এই বাস্তবতায় সেন্টমার্টিন সংরক্ষণের লক্ষ্যে দ্বীপটিকে চারটি পৃথক জোনে ভাগ করার প্রস্তাব এসেছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) প্রণীত এ পরিকল্পনা গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীর একটি কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়।

খসড়া মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্টমার্টিন দ্বীপকে চারটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ‘সাধারণ ব্যবহার এলাকা’ বা জোন–১–এ সীমিত পরিসরে পর্যটন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি থাকবে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় দ্বীপের সব হোটেল ও রিসোর্ট এই জোনে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে এবং কেবল এখানেই পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯০০ জন পর্যটক প্রবেশের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

জোন–২ বা নিয়ন্ত্রিত সম্পদ এলাকায় দিনে পর্যটক প্রবেশ করতে পারলেও রাতযাপন নিষিদ্ধ থাকবে। এটি কচ্ছপের প্রজনন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত এবং এখানে পর্যটন অবকাঠামো ও ক্ষতিকর কৃষি রাসায়নিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

জোন–৩ বা টেকসই ব্যবস্থাপনা অঞ্চলে বসতি স্থাপন ও অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। ম্যানগ্রোভ বন, ল্যাগুন ও কচ্ছপের প্রজনন ক্ষেত্র এই জোনে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় থাকবে।

ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ নিয়ে গঠিত জোন–৪ বা সংরক্ষিত এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। এই জোনের এক কিলোমিটারের মধ্যে মাছ ধরা, দূষণ সৃষ্টি ও বন্য প্রাণী বিরক্ত করার ওপর কড়াকড়ি আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘সেন্টমার্টিন ও পর্যটন কখনোই সমার্থক হতে পারে না। এই দ্বীপের প্রথম অগ্রাধিকার হতে হবে সংরক্ষণ।’

তিনি জানান, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ফলে দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র ইতোমধ্যে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সেন্টমার্টিনের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রবাল ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। অতিরিক্ত লবস্টার আহরণ ও জাহাজের নোঙরের আঘাতে প্রবালপ্রাচীর প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

খসড়া মহাপরিকল্পনায় বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুপারিশও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না—বাস্তবায়নে কঠোরতা না আনলে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ভবিষ্যতে কেবল স্মৃতিতেই টিকে থাকবে।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন