হোম খেলাধুলা দুই ঘোড়ার দৌড় থামানো জিরোনার রূপকথার গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক:

লা লিগায় ’জিরোনা’ রূপকথা চলছেই। দুই ঘোড়ার দৌড় নামে পরিচিত স্পেনের সর্বোচ্চ ঘরোয়া লিগে সবসময় দাপট দেখায় হয় রিয়াল মাদ্রিদ নতুবা বার্সেলোনা। এই দুই দলের বাইরে তৃতীয় শক্তি বলা যায় অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদকে। অথচ দুই পরাক্রমশালী প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে এই মৌসুমে লা লিগায় রাজত্ব করছে জিরোনা।

সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) লা লিগায় আলাভেসকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে জিরোনা। দুই অর্ধে করা ইউক্রেনের ফরোয়ার্ড আরতেম দোভেকের জোড়া গোল এবং পোর্তুর গোলে এই জয় পেয়েছে কাতালান দলটি।

লা লিগায় আগের দিন ভিয়ারিয়ালকে হারিয়ে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে উঠেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। একদিনের মধ্যেই জায়গাটা ফের দখলে নিয়েছে পুঁচকে জিরোনা। চলতি মৌসুমে ১৭ ম্যাচে ১৪ জয় ও ২ ড্রয়ে ৪৪ পয়েন্ট জিরোনার। মাত্র একটি ম্যাচে হেরেছে কাতালান ক্লাবটি। দুইয়ে থাকা রিয়ালের চেয়ে দুই পয়েন্ট এগিয়ে তারা।

অথচ এই ক্লাবটিই কিনা মাত্র এক মৌসুম আগে খেলত স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগ লিগ সেগুন্দা ডিভিশনে। ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০১৭-১৮ মৌসুমের আগে কখনোই স্পেনের শীর্ষ স্তরের লিগে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি তারা। ২০১৬-১৭ মৌসুমে সেগুন্দা ডিভিশনে লেভান্তের পেছনে থেকে রানার্সআপ হিসেবে লা লিগায় প্রমোশন লাভ করে ক্লাবটি। লা লিগায় প্রমোশন পেতে জিরোনাকে দীর্ঘ ৮৭ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

লা লিগায় প্রথম মৌসুমে ১০ম হলেও পরের মৌসুমেই ১৮তম হয়ে ফের সেগুন্দা ডিভিশনে নেমে যায় জিরোনা। তবে লা লিগায় নিজেদের প্রথম মৌসুমেই স্মরণীয় এক জয় পায় ক্লাবটি। তৎকালীন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছিল জিরোনা।

সিটি ফুটবল গ্রুপ ও গার্দিওলা

জিরোনার এই উত্থানের পেছনের গল্পটা চমকপ্রদ। এক অর্থে লা লিগার এই ক্লাবকে প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটির ভাতৃপ্রতিম ক্লাব বলা চলে। ম্যানচেস্টার সিটির উত্থানের পেছনে যে সিটি ফুটবল গ্রুপ, তাদের অবদান আছে জিরোনার উত্থানের পেছনেও।

আবু ধাবি ইউনাইটেড গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এই সিটি ফুটবল গ্রুপ বিশ্বব্যাপী ১২টি ক্লাবের মালিকানায় আছে। তার একটি জিরোনা। লা লিগার ক্লাব জিরোনার মালিকানায় সিটি ফুটবল গ্রুপের অংশিদারিত্ব আছে। ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট সিটি ফুটবল গ্রুপ এক ঘোষণায় জানায়, তারা জিরোনার মালিকানার ৪৪.৩ শতাংশ কিনে নিয়েছে। জিরোনার বাকি ৪৪.৩ শতাংশ মালিকানা জিরোনা ফুটবল গ্রুপের হাতে। আর এই গ্রুপের সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে ম্যানচেস্টার সিটিকে ট্রেবল জেতানো কোচ পেপ গার্দিওলার নাম। সিটি কোচের আপন ভাই পেরে গার্দিওলা আছেন জিরোনা ফুটবল গ্রুপের নেতৃত্বে।

জিরোনা ক্লাবটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন এই পেরে গার্দিওলা। তিনি সরাসরি ক্লাবটির ১৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক। ফুটবলারদের এজেন্ট হিসেবেও তার সুনাম আছে। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ফুটবল এজেন্ট পেরে গার্দিওলা। এক সময় লুইস সুয়ারেজ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার মতো কিংবদন্তির এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০৭-০৮ সাল থেকেই দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা জিরোনার দায়িত্ব ২০১৫ সালে নিজের হাতে নিয়ে নতুন জীবন দেন তিনি। ফরাসি ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ টিভিএই ও জিরোনার মধ্যে সেতুবন্ধ হয়ে ক্লাবের সকল দেনা শোধের বন্দোবস্ত করেন তিনি। ২০১৫-১৬ মৌসুমেই লা লিগায় উঠে আসার পথে ছিল জিরোনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্লে-অফে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়। তবে পরের মৌসুমেই স্বপ্নপূরণ হয়।

গত মৌসুমে লা লিগায় দশম হওয়া জিরোনার চলতি মৌসুমে এমন আগুনে পারফরম্যান্সের কারণ কী? এমন প্রশ্ন জাগছে অনেকের মনেই। এর পেছনে আছে সিটি গ্রুপ এবং পেরে গার্দিওলার বিচক্ষণ নেতৃত্ব। সিটি ক্লাবটির অংশিদারিত্ব কেনার পর থেকেই ম্যানচেস্টার সিটির একাডেমি থেকে প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়দের জিরোনায় খেলানোর সুযোগ করে দিতে থাকে। যে প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৬ সালে পাবলো মাফেওকে জিরোনায় ধারে খেলতে পাঠানোর মাধ্যমে। এই পথ ধরেই ফ্লরিয়ান লিখোয়ানে, রুবেন সাবরিনো এবং পাবলো মারিরা সিটি থেকে খেলতে আসেন জিরোনায়।

এভাবেই আরও প্রতিভাবানদের জিরোনায় খেলার সুযোগ করে দিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির পাইপলাইন শক্ত করতে থাকে সিটি গ্রুপ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ডগলাস লুইজের কথা। এই মুহূর্তে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব অ্যাস্টন ভিলায় খেললেও সিটিই তাকে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ভাস্কো ডা গামা থেকে ১২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে দলে টেনে জিরোনায় দুই বছরের জন্য ধারে খেলতে পাঠায়।

কিকে কারসেলের দূরদৃষ্টি

তবে এরপরও লা লিগা থেকে অবনমন ঠেকাতে পারেনি জিরোনা। ২০১৮-১৯ সালে অবনমিত হয়ে যায় তারা। এরপর তিন মৌসুম আর লা লিগায় উঠে আসতে পারেনি জিরোনা। ফলে ক্লাবের কৌশলে পরিবর্তন আনে তারা। এর পেছনে বড় অবদান স্পোর্টিং ডিরেক্টর কিকে কারসেলের।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ০২৩ সালে ৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ডায়নামো কিয়েভের ভিক্টর সাইগনকভকে এবং দিনপ্রো-১ থেকে ইউক্রেনিয়ান লিগে ৩০ ম্যাচে ২৪ গোল করা আরতেম দোভেককে সাড়ে ৭ মিনিয়ন ইউরোর বিনিময়ে নিয়ে আসেন। সেই সঙ্গে যোগ করেন ব্রাজিলের ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার সাভিওকে।

হাতেনাতে ফল পেয়েছে জিরোনা। চলতি মৌসুমে ১০ গোল এবং ৪ অ্যাসিস্ট করেছেন দোভেক। চলতি মৌসুমে লা লিগায় রিয়ালের জুড বেলিংহামের পর তিনিই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলের মালিক। অন্যদিকে সাভিও ১৭ ম্যাচে ৪ গোল এবং ৫ অ্যাসিস্ট করে লা লিগার অন্যতম সেরা পারফরমার হিসেবে নজর কেড়েছেন। তার দিকে চোখ বার্সেলোনার মতো ক্লাবের।

তবে জিরোনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাদের কোচ মিকেল সানচেজ। ৪৮ বছর বয়সী কোচ এর আগে খুব একটা সফলতা না পেলেও জিরোনা তার দিকনির্দেশনাতেই লা লিগায় রূপকথা নিয়ে হাজির হয়েছে। তার বিষয়ে জিরোনার প্রেসিডেন্ট ডেলফি গেলি বলেন, ‘মিকেল এমন একজন কোচ যাকে আমরা অনেকদিন থেকেই খোঁজ করছিলাম। তার পদ্ধতির প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ, যে কারণে এই ক্লাব তরুণ খেলোয়াড়দের উন্নতি করার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছে। আমরা প্রতিভার উন্নতি ও বেড়ে ওঠার একটা প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে পেরেছি।’

জিরোনা রিয়ালের তরুণ লেফট ব্যাক মিগুয়েল গুতিয়েরেজ, বার্সেলনার সেন্টার ব্যাক এরিক গার্সিয়ার মতো তরুণদের উন্নতির সুযোগ করে দিয়েছে। মাত্র ৪ মিলিয়ন ইউরোতে গুতিয়েরেজকে পেয়ে জিরোনাও লাভবান হয়েছে। এরিক অবশ্য ধারে খেলছে ক্লাবটির হয়ে। জিরোনার গুরুত্বপূর্ণ তরুণ প্রতিভার তালিকায় আছেন অ্যালেক্স গার্সিয়াও। ম্যানচেস্টার সিটির এই সাবেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের পুনর্জন্ম ঘটেছে। জিরোনার গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের তালিকায় আছে এমন কিছু খেলোয়াড় যারা তাদের সাবেক ক্লাবে ব্রাত্য হয়ে পড়েছিলেন। যে তালিকায় আছেন ডালি ব্লিন্ডের মতো অভিজ্ঞ তারকাও। আর এই সবকিছুর পেছনে মিকেলের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক ও অনুপ্রেরণাদায়ী কোচিংয়ের অবদান।

যাই হোক, লিগের এখনও অর্ধেকেরও বেশি বাকি। জিরোনার স্কোয়াডের গভীরতা খুব বেশি নয়। লিগের দীর্ঘ লড়াইয়ে ইনজুরিসহ অনেক কিছুই ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। তাই তো বার্সেলোনাকে ৪-২ গোলে হারিয়েও জিরোনার কোচ বলেন, এই মুহূর্তে রেলিগেশন ঠেকাতে পেরেই খুশি আমরা!’ তবে সীমিত সামর্থ নিয়ে জিরোনা যা করে দেখাচ্ছে তাতে প্রশংসা তাদের করতেই হয়। বলা যায় না, শেষ পর্যন্ত রূপকথার পথচলা সাফল্য এনে দিতেও পারে। লেস্টার সিটি রূপকথা তো খুব বেশি আগের কথা না। রূপকথার জন্ম দিতে পারে জন্যই তো ফুটবল এতো জনপ্রিয় খেলা।

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন