জাতীয় ডেস্ক :
‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।/পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি/দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।’-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতার বাস্তব চিত্র মিলছে পঞ্চগড়ে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে এক বিরূপ প্রভাব পড়েছে এ জনপদে বয়ে যাওয়া ৩৩টি নদীর ওপর। এক সময়ের খরস্রোতা প্রমত্তা নদীগুলো এখন যেন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদী পারাপারে অধিকাংশ স্থানে আর ব্যবহার করা হয় না নৌকা। হাঁটুপানি মাড়িয়ে পারাপার হন দুই পাড়ের মানুষ।
স্থানীয়রা বলছেন, ভরা বর্ষা মৌসুমে পঞ্চগড়ের অধিকাংশ নদীতে হাঁটুপানি থাকে। বর্তমানে শীতের শুরুতে নদীগুলো দেখে মনে হচ্ছে, শীর্ণকায় এক একটি খাল। গত এক দশক ধরে এভাবে প্রবাহ কমতে থাকা নদীগুলো খননে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ১৭২ কিলোমিটার নদী খনন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ সীমান্ত নদী খনন না হওয়ায় সরকারের এই উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখছে না। নদীগুলোতে পানিস্বল্পতার কারণে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে নদীনির্ভর কৃষক ও শ্রমিকদের। কোনো কোনো স্থানে নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ায় মরুর আকার ধারণ করেছে।
জেলার অধিকাংশ নদী হিমালয়ের স্রোত ধারায় জেলার বুকচিরে বহমান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নদী করতোয়া, চাওয়ায়, তালমা, মহানন্দা, ডাহুক। উজান থেকে বেয়ে আসা পঞ্চগড়ের নদীগুলোতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যে বিরুপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, গত কয়েক বছর আগেও পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া, চাওয়ায়, তালমা, মহানন্দা, ডাহুক, বেরং নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ছিল। নদীতে মাছ শিকারের পাশাপাশি জেলার পাথর শ্রমিকদের একটি অংশ উজান থেকে বেয়ে আসা নদীর পানিতে নুড়িপাথর সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তবে পানি না থাকায় ছোট মাছ হারানোর পাশাপাশি এক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এ জনপদের নদীকেন্দ্রিক মানুষদের মাঝে।
সবচেয়ে বেশি নাব্য সংকটে দুর্ভোগে পড়েছে জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ডাহুক নদীর দুপাড়ে বসবাসকারী হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। কারণ কৃষি, নুড়িপাথর সংগ্রহ ও মাছ শিকারে তাদের একমাত্র ভরসা নদীর পানি। একইসঙ্গে ভুতিপুকুর এলাকার উত্তর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকা করতোয়া নদীটি দক্ষিণ সীমান্ত ভজনপুর হয়ে জেলা সদরের মিরগড় ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় বহমান হলেও আশপাশের বসবাসরত সাধারণ মানুষ নদীর সুফল থেকে বঞ্চিত।
করতোয়া নদীতে নুড়িপাথর সংগ্রহে আসা পাথর শ্রমিক মোস্তফা ও কামাল সময় সংবাদকে বলেন, ‘আমরা নদীতে নুড়ি পাথর সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় বর্তমানে পাথর পাওয়া যায় না। এতে চরম সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে আমাদের।’
মাছ ধরতে আসা বৃদ্ধ আলতাব হোসেন বলেন, ‘জীবনের একটা বড় সময় নদীতে বিলিয়ে দিয়েছি। একসময় প্রচুর মাছ শিকার করতাম। বর্তমানে উজানে বাঁধের কারণে আর নদীতে পানিও নেই, মাছও নেই। এই কাজ করে এখন আর সংসার চালানো যায় না।’
এদিকে জেলার সবচেয়ে বড় নদী করতোয়াকে ঘিরেই গড়ে ওঠে প্রান্তিক জনপদের শহর পঞ্চগড়। বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, শত বছর আগেও এই করতোয়া নদীতে চলত বড় নৌকা। নৌকায় করে সওদা নিয়ে ভিড়ত পঞ্চগড়ের ঘাটে ব্যাপারিরা। কিন্তু কালের বিবর্তনে করতোয়ার এখন মরণদশায় পরিণত। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর দুই তীরে তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল বালুচর। করতোয়া ছাড়াও একই অবস্থা জেলার বাকি নদীগুলোর।
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া সময় সংবাদকে বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নদীর আশপাশের জমি চাষের আওতায় আনায় এবং ক্রমাগতভাবে দখল-দূষণে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন খনন না করায় নদীগুলো মরা খালে পরিণত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। এতে এলাকায় মরুকরণসহ কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না গেলে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে। নদীগুলোকে দলখ ও দূষণমুক্ত করেতে সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া দরকার।
এদিকে, পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক সময় সংবাদকে বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় ৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৮টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জেলার ১৭২ কিলোমিটার নদী খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আরও ১৪৪ কিলোমিটার নদীর খনন কাজের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব নদী উজান থেকে আসা, সেগুলোর পানি আমরা কতটুকু পাচ্ছি এবং এ পানি কোথায় ধরে রাখলে শুষ্ক সময়ে আমরা ব্যবহার করতে পারব, সে বিষয়ে সার্ভে চলছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে সার্ভের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পাওয়া যাবে। আশা করি, সেই রিপোর্টে নদীতে পানিস্বল্পতা নিরসনে একটা সমাধান পাওয়া যাবে।’
