হোম খেলাধুলা কাতার বিশ্বকাপে স্মরণীয় ১০ মুহূর্ত

ফুটবল বিশ্বকাপ :

একটা মাস গোটা বিশ্বের চোখ ছিল কাতারে। দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের মঞ্চ মরুভূমি। মাঠের লড়াই ছিল রোমাঞ্চে ঠাসা। অঘটন আর নাটকীয়তায় ভরা একটি বিশ্বকাপ দেখল ফুটবলবিশ্ব।

জমকালো আয়োজনে আর্জেন্টিনা-ফ্রান্সের ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল বিশ্বকাপের ২২তম আসরের। কাতার বিশ্বকাপটা অনেকের মনেই থেকে যাবে অনন্য এক উচ্চতায়। কী নামে ডাকা যায় একে? অঘটনের বিশ্বকাপ?

যেভাবে শুরু হয়েছিল আসরটি, তাতে এই নামটাই সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে হচ্ছিল। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় ম্যাচেই তো ঘটে গিয়েছিল অবিশ্বাস্য এক অঘটন! সৌদি আরবের কাছে হেরে গিয়েছিল ফেবারিট আর্জেন্টিনা, যারা কিনা শিরোপাটাই জিতে নিলো। এরপর এমন আরও কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল, যা মনে থেকে যাবে বহু দিন। চলুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক সেসব মুহূর্ত:

সৌদির কাছে আর্জেন্টিনার হার: গ্রুপপর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খায় আর্জেন্টিনা। সৌদি আরবের সঙ্গে ২-১ গোলে হেরে যায় লাতিন আমেরিকার জায়ান্টরা। প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন লিওনেল মেসি। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি বেশিক্ষণ। দ্বিতীয়ার্ধে সবাইকে অবাক করে দিয়ে গোল শোধ করে মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রটি। দলের প্রথম গোলটি করে ম্যাচে সমতা ফেরান সালেহ আল সেহরি। সমতা ফেরানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দ্বিতীয় গোল করেন সালেম আল-দাওসারি।

জয় পেয়েও দক্ষিণ কোরিয়ার অপেক্ষা: গ্রুপপর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে পর্তুগালকে ২-১ গোলে হারিয়েও শেষ ষোলোয় স্থান নিশ্চিত করতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১০ মিনিট। এ সময় উরুগুয়ে বনাম ঘানার ম্যাচে চোখ ছিল এশিয়ার দেশটির। সেই ম্যাচে অতিরিক্ত সময় দেয়া হয়েছিল ১০ মিনিট। উরুগুয়ে একটি গোল দিতে পারলেই ছিটকে যেত কোরিয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পারেননি সুয়ারেজরা। আর এতে দর্শকের কাছে ছুটে গিয়ে তাদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন কোরিয়ার ফুটবলাররা।

জাপানের কাছে জার্মানির হার: ফুটবলবিশ্বকে অবাক করে গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে জাপানের কাছে হেরে বসে জার্মানি। প্রথমার্ধে ইলকায় গুন্ডোগানের গোলে এগিয়ে ছিল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা রিৎসু দোয়ান ও তাকুমা আসানোর গোলে জিতে যায় সূর্যোদয়ের দেশটি।

নাটকীয়তায় ভরা ছিল ‘সি’ গ্রুপ: গ্রুপের প্রথম দুটি ম্যাচের একটিতে জাপানের কাছে হারে জার্মানি এবং আরেকটিতে কোস্টারিকাকে ৭ গোল দেয় স্পেন। পরের রাউন্ডে যেতে হলে গ্রুপের শেষ ম্যাচটি জিততেই হত জার্মানিকে। স্পেনকে জিততে হতো জাপানের বিপক্ষে। তাহলেই তারা গ্রুপ শীর্ষে থেকে পরের রাউন্ডে যেতে পারত। সেভাবে সব ঠিকঠাক চলছিলও। প্রথমার্ধের খেলা শেষে স্পেন এবং জার্মানি দুই দলই এক গোলে এগিয়ে ছিল।

তারপরই সব ওলটপালট হয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ৩ মিনিটের ব্যবধানে পরপর দুই গোল দিয়ে দেয় জাপান। অন্যদিকে কোস্টারিকাও ম্যাচের স্রোতের বিপরীতে দুই গোল দিয়ে এগিয়ে যায়। অবশেষে জার্মানি ৪-২ গোলে ম্যাচটি জিতে যায়। কিন্তু গোল শোধ করতে পারেনি স্পেন। জাপানের কাছে তারা ২-১ গোলে হারে।

এর ফলে বদলে যায় সব সমীকরণ। দুই ম্যাচ জিতে গ্রুপ শীর্ষে থেকে পরের রাউন্ডে যায় জাপান। একটি ম্যাচে জয় এবং একটি ড্র করে গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে পরের রাউন্ডে যায় স্পেন। গোল পার্থক্যে গ্রুপপর্ব থেকে ছিটকে যায় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

গোল করে লাল কার্ড: প্রথম কোনো আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারায় ক্যামেরুন। লাতিন আমেরিকার জায়ান্টদের বিপক্ষে ক্যামেরুনের হয়ে জয়সূচক একমাত্র গোলটি করেন ভিনসেন্ট আবুবকর। গোল উদ্‌যাপন করতে গিয়ে নিজের জার্সি খুলে ফেলেন আফ্রিকান এই স্ট্রাইকার। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। ম্যাচের প্রথম দিকে একটি হলুদ কার্ড আগে থেকেই দেখেছিলেন তিনি। ফলে দুটি হলুদ কার্ড হওয়ায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় আবুবকরকে।

ইতিহাসের পাতায় নারী রেফারি: সি গ্রুপে মেক্সিকো-পোল্যান্ড ম্যাচে প্রথম নারী রেফারি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ঢোকেন স্টেফানি ফ্র্যাপার্ট। ম্যাচের চতুর্থ রেফারির দায়িত্বে ছিলেন ফরাসি এই নারী রেফারি। পরে ‘ই’ গ্রুপে জার্মানি-কোস্টারিকা ম্যাচে স্টেফানি ফ্র্যাপার্ট বাঁশি বাজিয়ে খেলা শুরুর নির্দেশ দিতেই তৈরি হয় আরও একটি ইতিহাস। ৯২ বছরের ইতিহাসে যা হয়নি তাই এবার কাতার বিশ্বকাপে দেখল বিশ্ব। এই প্রথম পুরো একটা ম্যাচ পরিচালনা করে গোটা নারী রেফারি দল। ফ্র্যাপার্টের সঙ্গে ছিলেন ব্রাজিলের নেউজা ব্যাক এবং মেক্সিকোর ক্যারেন ডিয়াজ। প্রধান রেফারির দায়িত্বে ছিলেন ফ্র্যাপার্ট আর অ্যাসিসট্যান্ট দুই রেফারির দায়িত্ব পালন করেন নেউজা ও ডিয়াজ।

রোনালদোর চোখে পানি: পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম একাদশের বাইরে রেখেই দল সাজিয়েছিলেন ফার্নান্দো সান্তোস। সেই ম্যাচে ৬-১ গোলে জিতেছিলেন সেলেকাওরা। মরক্কোর বিপক্ষেও সিআরসেভেনকে দলের বাইরে রাখেন সান্তোস। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে এক গোলে পিছিয়ে পড়ে পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকাকে মাঠে নামালেও গোল করে উঠতে পারেনি তার দল। মরক্কোর কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হয় পর্তুগিজদের। চোখের পানিতে মাঠ ছাড়েন পর্তুগিজ মহাতারকা। তার অশ্রুসিক্ত মাঠ ছাড়ার দৃশ্য হৃদয় ছুঁয়ে গেছে কোটি ফুটবল ভক্তের।

মরক্কো সমর্থকদের বাঁশি: আফ্রিকার প্রথম কোনো দল হিসেবে কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল মরক্কো। দলকে উৎসাহ দিতে প্রতিটি ম্যাচেই ভরপুর ছিল গ্যালারি। শেষ ষোলোয় স্পেন, কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগাল কিংবা সেমিতে ফ্রান্সের বিপক্ষে হোক, বল যখনই প্রতিপক্ষের পায়ে গেছে, তখনই বেজে উঠেছে মরক্কোর সমর্থকদের বাঁশি। সেই শব্দ প্রতিপক্ষের কানে তালা লাগানোর জন্য যথেষ্ট ছিল।

এমবাপ্পেকে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সান্ত্বনা: কাতার বিশ্বকাপের ট্র্যাজিক হিরো কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও দলকে জেতাতে পারেননি ফরাসি তারকা। টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে হারতে হয়েছে দিদিয়ের দেশমের দলকে। ম্যাচ শেষে বিধ্বস্ত এমবাপ্পেকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এসেছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বুকে জড়িয়ে ধরেন তাকে।

মেসির হাতে বিশ্বকাপ: অমরত্বের সুধা পান করলেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপে নিজের শেষ ম্যাচে যত অপ্রাপ্তি ছিল সবই মিটিয়েছেন তিনি। নিজের শেষ বিশ্বকাপে বুক চিতিয়ে লড়াই করে দলকে শিরোপা জিতিয়েছেন। লুসাইল স্টেডিয়াম থেকে খোলা বাসে ট্রফি হাতে জয় উদ্‌যাপন করেন লিওনেল মেসিরা। মারিয়া-মার্টিনেজরা আগলে রাখেন ট্রফি। যেন সাত রাজার ধন, এক মুহূর্তেও যাকে হাতছাড়া নয়। তাইতো স্টেডিয়াম থেকে টিম হোটেল, দূরত্ব হোক-না যতই। ভালোবাসার কাছে সবই তো নস্যি। প্রিয় খেলোয়াড়কে দেখতে রাস্তার দুপাশে ভিড় করেন হাজার হাজার সমর্থক। ইতিহাসের স্মরণীয় মুহূর্তকে করেন ফ্রেমবন্দি।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন