হোম অর্থ ও বাণিজ্য সমস্যা থাকলেও সক্ষমতা ও সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের

বাণিজ্য ডেস্ক :

‘দেশ রসাতলে গেল’- এমন কথা বলা নৈরাশ্যবাদী সাধারণ মানুষের জন্য স্বভাবজাত। কিন্তু দেশের যখন কয়েকটি শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা বারবার বলতে থাকে, তখন এটিকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

বৈশ্বিক কারণে বাংলাদেশের মানুষ অতিপ্রাকৃত কোনো অবস্থানে নেই। এটা না অনেক ভালো, না শোচনীয়। সারা বিশ্ব যেমন একটি সংকটের মধ্যে আছে, বাংলাদেশও প্রায় একই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

পশ্চিমাদের বেহাল দশা

‘নগর পুড়িলে দেবালয় কী এড়ায়?’- পশ্চিমে অর্থনীতি জ্বলছে মূল্যস্ফীতি নামক দাবানলের আগুনে। করোনা সংকট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই শুরু হয়ে গেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এরপর পাল্টাপাল্টি সহস্রাধিক নিষেধাজ্ঞা। এই নিষেধাজ্ঞার বাণে সরবরাহ ব্যবস্থা টালমাটাল, দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী, জ্বালানি সংকট চরমে। বিশেষ করে রাশিয়া ইউরোপের সবচেয়ে বড় গ্যাস পাইপলাইন নর্ড স্ট্রিম-১ বন্ধ করে দেয়ার পর চোখেমুখে অন্ধকার দেখছে পশ্চিমারা।
যেখানে ইউরোপকে বলা হতো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশ, সেখানে ইউরোপের বাসিন্দারাই নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বমুখিতার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। মস্কো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ায় গড়ে প্রতিটি জার্মান পরিবারকে গ্যাস-বিদ্যুতের বিল বাবদ আড়াই গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়েছে দেশটির শিল্প উৎপাদন।

একই দশা যুক্তরাজ্যের। কদিন আগেই মূল্যস্ফীতি বিগত ৪২ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে যুক্তরাজ্যে। একদিকে পণ্যের দাম, অন্যদিকে বিল পরিশোধের চাপ। দ্বিমুখী চাপে বিপর্যস্ত ব্রিটিশ নাগরিকদের জীবন। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ফিন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটির (এফসিএ) এক জরিপে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রতি চারজনের একজন শুধু বিলের খরচ মেটাতেই বড় রকমের আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।

জরিপ অনুসারে, যুক্তরাজ্যের ৬০ শতাংশ মানুষ বিল পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। যেখানে ২০২০ সালের করোনাভাইরাসের সময়েও বিলের চাপে পর্যদুস্থ মানুষের সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ, সেখানে চলতি সময়ে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখে।

ইউরোপের বর্তমান অর্থনীতি নিয়ে ডেনমার্কের অর্থনীতিবিদ এলেন সোরেনসেন বলেন, মানুষ এখন আর মানিব্যাগে টাকা নিয়ে না দুঃস্বপ্ন নিয়ে ঘুরছে। সোরেনসেনের দেশ ডেনমার্কেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১ শতাংশে। দেশটির পরিসংখ্যান বলছে, বিগত ৪০ বছরেও এত বেশি মূল্যস্ফীতি প্রত্যক্ষ করেনি ডেনমার্ক। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায়, চলতি বছর সেপ্টেম্বরে দেশটির নাগরিকদের ভোগ্যপণ্য কিনতে হচ্ছে ১১ দশমিক ১ শতাংশ বেশি দাম দিয়ে, যা ১৯৮২ সালের পর সর্বোচ্চ।

ব্লুমবার্গ ও ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ বলছে, মন্দার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ইউরোপ। চলতি বছর অক্টোবরে টানা চতুর্থ মাসের জন্য ইউরোপের প্রাইভেট খাতের ব্যবসায়িক কার্যক্রম হ্রাস পেয়েছে, যা মন্দার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউরোপের আঁচ লাগছে কোথায়?

প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপের মন্দার বাতাস কেন দক্ষিণ এশিয়ার গায়ে লাগছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি অনেকটা ইউরোপকেন্দ্রিক আমদানি-রফতানিনির্ভর। তাই ইউরোপের মানুষের হাতে যদি টাকা না থাকে, তারা পণ্য কম কিনবে। এতে কমে যাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রফতানি। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটে ইউরোপের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে আমদানি ব্যবস্থায় ধস নামবে এবং বেড়ে যাবে আমদানি খরচ। তাছাড়া উপরি ঝামেলা হিসেবে আছে রাশিয়া-ইউক্রেনের কারণে সৃষ্ট সরবরাহ ব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনা ও বাড়তি জাহাজ ভাড়ার ঝামেলা।

শুধু ইউরোপ না, অর্থনৈতিকভাবে বিপদে আছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত। ভারতীয় মুদ্রা রুপির মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে অব্যাহতভাবে কমছে। সেই সঙ্গে দেশটির আরেক উদ্বেগের কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। চলতি বছর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে দেশটির রিজার্ভ ৫২৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। যা ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময়মূল্য ৮৩ দশমিক ২৯ এর সর্বনিম্ন রেকর্ড ছুঁয়েছে।
একইভাবে খাদের কিনারায় আছে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি। জিরো কোভিড পলিসির কারণে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে চীন। আফ্রিকার দেশগুলোতে দেখা দিয়েছে মন্দাভাব।

বাংলাদেশের আশার আলো
ইউরোপে বাজার খারপ হওয়ায় বিপদে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতিও। তবে এটি আর দশটি সংকটের মতোই। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, মানুষ কষ্টে আছে- এ কথা সরকার পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে। তবে মন্দা কিংবা দুর্ভিক্ষের ভয় পাওয়ার মতো কিছু ঘটেনি- বলছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক সময় সংবাদকে বলেন, আমরা সংকটের মধ্যে আছি এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে সংকট কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতাও আমাদের আছে। রেমিট্যান্স কমছে তবে প্রতিনিয়ত কিন্তু রেমিট্যান্স আসছে। আমাদের দেশের বাইরে যে জনশক্তি এটা আমাদের অর্থনীতির বড় শক্তি। আবার আমাদের পোশাক-কারখানা ওষুধ শিল্প অনেক শক্তিশালী। এখানে নানা ধাচের উত্থান -পতন আছে। কিন্তু এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়নি যে এগুলো অকেজো হয়ে গেছে। এখন হয়তো ছোট কোম্পানিগুলো বিপদে আছে, রফতানি কিছুটা কমেছে, তবে এটা সংকট, দুর্যোগ কিন্তু না।

রুমানা হক আরও বলেন, সবচেয়ে আশার ব্যাপার আমরা আগে থেকেই সমস্যা ধরতে পেরেছি। আমরা জানি কোথায় সংকট। আপনি সংকট জানলে, আলোচনা করলে, সমাধান বের হয়ে আসবে। আমি মনে করি আমাদের নিজেদের যে সক্ষমতা রয়েছে সেখানে একটি সমন্বয় দরকার। সরকার নিঃসন্দেহে চেষ্টা করে যাচ্ছে। সুশাসনের দিকে নজর দিয়ে কাজ করে গেলে সংকট সামাল দেয়া আমাদের জন্য কঠিন হবে না।

বর্তমানে সব সংকট ছাপিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের নিজস্ব যে গ্যাস ও কয়লা আছে তা কাজে লাগাতে পারলে সংকট মোকাবিলা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সম্পদ নিয়ে কাজের পরিধি বাড়াতে হবে।

সংকটের মধ্যেই ভোলার শাহবাজপুরের নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, শাহবাজপুরের টবগী-১ অনুসন্ধান কূপে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস পাওয়া যাবে। সরকার দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে কাজ করছে। ২০২২-২০২৫ সালের মধ্যে পেট্রোবাংলা মোট ৪৬টি অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানান মন্ত্রী।

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ক্লিন এনার্জি খাতে বিনিয়োগে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর। বিনিয়োগের জন্য তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ চায়। যাতে করে তারা বিনিয়োগের লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে পারে।

লোডশেডিং মানুষের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা সৃষ্টি করলেও ধীরে ধীরে এ সংকটও প্রশমিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান জানান, আগামী ডিসেম্বর থেকে লোডশেডিং থাকবে না। এক্ষেত্রে শীতের অপেক্ষায় সরকার। সে সময় চাহিদা কমলে, সংকট কাটবে। এ ছাড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আগামী ডিসেম্বরে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

জাতিসংঘ ও বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (এফএও) খাদ্য সংকটের অশনিসংকেত দিয়ে আসছে কয়েক মাস ধরে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, আগামী বছর (২০২৩ সাল) বিশ্বের ৪৫টি দেশে তীব্র খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে ক্ষুধামান্দায় ভুগতে পারে প্রায় ২০ কোটি মানুষ।

বৈশ্বিক অবস্থা যে বিপদের মুখে, এর পূর্বাভাস শুরু থেকে দিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক। সম্প্রতি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে মন্দা শুরু হলে ৩৫ কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে পড়বে। এরই মধ্যে ৪৮টি দেশের ৪ কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে আছে বলে জানায় সংস্থা দুটি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বিভিন্ন বক্তব্যে দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে উত্তরণের পথ প্রধানমন্ত্রী নিজেই বাতলে দিচ্ছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ যাতে দুর্ভিক্ষের কবলে না পড়ে, সে জন্য খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রতি ইঞ্চি জমি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতে হবে।

এ ছাড়া খাদ্য উৎপাদনের জন্য আলাদা বাজেট রাখা আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কটা আলাদা বাজেটও রেখেছি। এই বাজেটটি হবে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে। সেই প্রস্তুতি নেয়া আছে। যার যার জায়গা আছে চাষাবাদ শুরু করে দেন। আদি যুগে ফেরত যান। পেট ভরে খেতে পারবেন। শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন। আওয়াজ-টাওয়াজ পাবেন না। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশ চলার জন্য যতটুকু বিদ্যুৎ প্রয়োজন সেটা দিতে পারব। সেটা পাবেন।

খাদ্যাভাব থেকে বাংলাদেশের বাঁচার প্রধান রক্ষাকবচ কৃষি–এ কথা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাস ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কৃষিই অন্যতম প্রধান নিয়ামক। কৃষি জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ, কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের কাঁচামাল সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি খাদ্যপণ্য উচ্চমূল্যে বিশ্ববাজারে রফতানির মাধ্যমে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে নিরাপদ ও পুষ্টি সমৃদ্ধ মৌসুমি ফলমূল, শাকসবজি ও প্রাণিজ আমিষ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

কয়েকটি জরিপে দেখা যায়, কঙ্গো, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, সুদান, দক্ষিণ সুদান, সোমালিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, হাইতি, নাইজার, কেনিয়া, মালাউ, বুর্কিনা ফাসো, জিম্বাবুয়ে, গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, আফ্রিকান রিপাবলিক, চাদ, মাদাগাস্কার ও মালির মতো দেশগুলো বর্তমানে বড় রকমের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ভুগছে। এদের তুলনায় বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জিম্বাবুয়েতে ৬৮ শতাংশ, লেবাননে ৩৬, ইরানে ৩২, শ্রীলঙ্কায় ২২, হাঙ্গেরিতে ১৮, কলম্বিয়ায় ১৫, জিবুতিতে ১৪, রুয়ান্ডা ১৪ এবং বুর্কিনা ফাসোয় ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এদের তুলনায় বাংলাদেশ বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ সময় সংবাদকে বলেন, আমরা দুটি ঝুঁকিতে আছি। এক রিজার্ভ নিয়ে, আরেকটি জ্বালানি সংকট। তবে ঝুঁকি প্রশমনের সক্ষমতা আমাদের আছে। সংকটের মধ্যে আবার আশার আলোও কিন্তু আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরে আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। আমরা ভেবেছিলাম দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা আসতে পারে, কিন্তু এখন পর্যন্ত ভয়টা সত্যি হয়নি। বিগত দুই মাসে ওদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক থেকে বের হয়ে ২ শতাংশের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে যে আমরা ভয় পেয়েছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বাজার হারাবে বাংলাদেশ, সেই ভয়টা কিন্তু কাটতে শুরু করেছে।

মাশরুর রিয়াজ বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় আশার আলো আমাদের কৃষিখাত। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ জড়িত। এ খাতটি এখন পর্যন্ত ঠিক আছে। এখানে পর্যাপ্ত সার, সেচ ও কৃষককে সুবিধা দিতে পারলে এ খাত থেকেই আমরা সংকট মোকাবিলার শক্তি পাব। এ ছাড়া আইএমএফ থেকে আমরা একটা বড় অঙ্কের টাকা পাব বলে আশা করছি। এই টাকাটা পেলে আপাতত সংকট অনেকখানি সামাল দেয়া যাবে।

মাঠ, পাহাড়, সমুদ্রে সম্ভাবনা

কৃষিখাত কেবল দেশীয় অর্থনীতি না, ব্যক্তিগত বিনিয়োগেও হতে পারে অনেক বড় একটি মাধ্যম। ব্যবসা বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের শিকড়ে ফিরে যেতে হবে। এখনো গ্রামবাংলার অনেক জমি পড়ে আছে যেখানে একবারের বেশি আবাদ হয় না। এসব জমি ব্যবহার করতে পারলে একদিকে যেমনি বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবেন, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে সম্ভাব্য মন্দা মোকাবিলায় কৃষিখাতে বিনিয়োগকে সংকট মোকাবিলায় সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কৃষিবিদ কামরুন নাহার সময় সংবাদকে বলেন, কেউ যদি বড় আকারে কৃষিখাতে বিনিয়োগ করে সেখান থেকে তার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা অনেক। বিশেষ করে ধান-গমের বাইরে বাদাম, সয়াবিন, তিল ও নানা ধরনের ফলসহ যেসব কৃষিপণ্য আমদানি করা হয়, সেসব দেশের মাটিতে চাষ করা গেলে সেখান থেকে বিনিয়োগকারী যেভাবে লাভবান হবেন একইভাবে দেশের সংকট মোকাবিলায়ও এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ হবে।

অন্যদিকে সমতল ভূমি ছাড়াও বাংলাদেশের পাহাড়ি ভূমির প্রতি ভাঁজে লুকিয়ে আছে অফুরান সম্ভাবনা। দেশের আয়তনের ১০ ভাগের ১ ভাগজুড়ে রয়েছে ১৩ হাজার ১৮৪ বর্গকিলোমিটারের পার্বত্য এলাকা। প্রায় ১৭টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সেটেলার বাঙালি মিলিয়ে পার্বত্য এলাকার জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার।

ধান-গম ছাড়াও পাহাড়ে চাষ হয় নানা ধরনের মৌসুমি ফল, উচ্চ দামের মসলা ও রাবার। বাংলাদেশ কৃষি অধিদফতরের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে ৫৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয় ও ৯৮ হাজার হেক্টর জমিতে উদ্যান ফসলের চাষাবাদ হয়ে থাকে।

খাগড়াছড়ি কৃষি অধিদফতরের তথ্য থেকে দেখা যায়, কেবল এক জেলায়ই বছরে এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের কৃষিপণ্য বাজারজাত করা হয়ে থাকে। খাগড়াছড়ির পাশাপাশি রাঙামাটি ও বান্দরবানেও প্রায় সমমূল্যের কৃষিপণ্য বেচাকেনা হয়।

স্থানীয় কৃষি অফিসগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পার্বত্য অঞ্চলগুলো দিনকে দিন কমলা, মাল্টা ও ড্রাগন চাষে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠছে। এ ছাড়াও মসলার মধ্যে হলুদ, দারুচিনি ও এলাচ চাষের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এসব চাষাবাদের বাইরেও এখনও পাহাড়ে ৫ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে আছে, যেখান থেকে নির্দিষ্ট ফসল চাষ করে বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, পাহাড়ি ঢালে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য ভালো কলা, আনারস, মাল্টা, কমলা, পেঁপে, আম ও কাঁঠাল। এ ছাড়া রাম্বুটান, ড্রাগন ফল, প্যাসন ফল, স্ট্রবেরি, কাজুবাদামের মতো বিদেশি ফলেরও উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

পাহাড়ে ভাঁজে ভাঁজে যেমনি রয়েছে সম্ভাবনা তেমনি সমুদ্রের অতলেও রয়েছে অর্থনৈতিক বিকাশের গোপন চাবিকাঠি। ২০১২ – ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার ও ভারতের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর তা বাংলাদেশের পক্ষে গেছে। ফলে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০ শতাংশ। এতে করে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার নতুন সমুদ্র অঞ্চল পেয়েছে বাংলাদেশ- যা সমুদ্র সম্ভাবনাকে অনেকাংশে বৃদ্ধি করেছে।

সারা বিশ্বেই ব্লু ইকোনমির ধারণা বিকশিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বাংলাদেশে ব্লু ইকোনমি আরও অনেক বিষয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যার ভেতর খাদ্য উৎপাদন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, পরিবেশের ঘাত প্রতিঘাত সহনক্ষমতা বৃদ্ধি, জড়িত। প্রাতিষ্ঠানিক এবং নিয়মতান্ত্রিক সমঝোতা, নথি বা তথ্য, সামুদ্রিক পণ্য উদ্ভাবন ও ভিন্নতা সৃষ্টি করা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা জারি রাখা, জনগণের ভেতর সচেতনতা সৃষ্টি, বিপণন কৌশল বের করা, উপকূলীয় অঞ্চলে দক্ষ জনবল তৈরি করা এবং প্রয়োজনীয় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

দর্শনের দুটি পরিচিত টার্ম হচ্ছে আশবাদ ও নৈরাশ্যবাদ। একটি আধগ্লাস পানিকে একজন আশাবাদী দেখেন গ্লাসটি আধেক পূর্ণ এমন চোখে, একজন নৈরাশ্যবাদীর চোখে গ্লাসটি আধেক খালি। কিন্তু পিপাসা মেটাতে খালি গ্লাস না দেখে যেটুকো পানি আছে তা দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়াতে বিশ্বাস করেন আশাবাদীরা। অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলাদেশের সংকট আছে। কিন্তু সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের আছে সমূহ সম্ভাবনা ও তা কাজে লাগানোর সক্ষমতা। সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ- এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন