হোম জাতীয় রোহিঙ্গা সংকটের ৫ বছর: ক্যাম্পে ৪ বছরের সমান মামলা ১ বছরে

জাতীয় ডেস্ক :

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে আশ্রয়ের সন্ধানে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের ঢল নেমেছিল বাংলাদেশে। আজ বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) বিশ্বের আলোচিত এ সংকটের পাঁচ বছর পূর্ণ হলো। এই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২ ধরনের অপরাধে মামলা হয়েছে ২ হাজার ৪৩৮টি। তবে উদ্বেগজনক হলেও, গত এক বছরে মামলার সংখ্যা এর আগের চার বছরের মোট মামলার প্রায় সমান।

এসব মামলায় অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার বেড়ে যাওয়ায় বিশ্লেষক ও সচেতন মহল ইতিবাচক বলে মনে করলেও হত্যা, ধর্ষণ ও অপহরণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বলেছেন, এটা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে বাড়ছে। যা আঞ্চলিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিও হতে পারে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২২ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২ ধরণের অপরাধে মোট ২ হাজার ৪৩৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। যেখানে মোট আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ২২৬ জন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫ বছরে অস্ত্র উদ্ধার মামলা ১৮৫টি, মাদক উদ্ধার মামলা ১ হাজার ৬৩৬টি। ধর্ষণ মামলা ৮৮টি। অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় বা আদায়ের চেষ্টায় মামলা হয়েছে ৩৯টি। এছাড়া ৫ বছরে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে ১১০টিরও বেশি। যদিও ৫ বছরে হত্যা মামলার সংখ্যা ১০০টি। যেখানে জোড়া খুন, ৬ খুনের ঘটনাও রয়েছে।

এর আগে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪ বছরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ডাকাতি বা ডাকাতির প্রস্তুতি, হত্যা, মানব পাচারসহ ১২ ধরনের অপরাধে ১ হাজার ২৯৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০টি খুন, ৭৬২টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৮৭টি অস্ত্র, ৬৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতি এবং ৩৪টি অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মামলা ও অন্যান্য আইনে ৮৯টি মামলা।

২০১৭ সালে নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ৭৬টি আর আসামি হন ১৫৯ জন। ২০১৮ সালে ২০৮ মামলায় আসামি ৪১৪ জন। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৬৩টি আর আসামি হন ৬৪৯ জন। ২০২০ সালে ১৮৪ মামলায় ৪৪৯ জন রোহিঙ্গা আসামি হন। ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫৬৭টি মামলায় ১ হাজারের ওপরে রোহিঙ্গা আসামি হয়েছিল। এতে গত এক বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২ অপরাধে মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪০টি। যেখানে অস্ত্র উদ্ধার ৯৮টি, মাদক উদ্ধার ৮৭৪টি, ধর্ষণ ২৩টি ও হত্যা মামলা ৩০টি।

পরিসংখ্যানমতে, ক্যাম্পে আগের ৪ বছরের মামলার সংখ্যার প্রায় সমান মামলা হয়েছে গত এক বছরে।

রোহিঙ্গা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের সব শরণার্থী সংকট দীর্ঘায়িত হলে ২ ধরনের অপরাধ বাড়তে থাকে। যার একটি নিজেদের মধ্যে সংঘাত, অপরটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও এমনটিই হচ্ছে।

এ অধ্যাপক আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের ফলে সীমান্তে অবৈধ বাণিজ্যের হার বাড়ছে। স্থানীয়রাও মাদক ও অস্ত্র পাচারে রোহিঙ্গাদের বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছে। এদিকে অলস সময় পার করায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে রোহিঙ্গারা অবৈধ বাণিজ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

রোহিঙ্গা নিয়ে এ গবেষক আরও জানান, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যত দেরি হবে ততটাই হুমকির মুখে পড়বে দেশ। প্রতিটি শরণার্থী সমস্যা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। রোহিঙ্গা সংকট তার বাইরে নয়।

রোহিঙ্গা ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, মামলার সংখ্যা দিয়ে অপরাধ বিশ্লেষণ করা যাবে না। মামলাগুলো আদালতে বিচারাধীন। তবে কিছুটা অস্বাভাবিক বা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এপিবিএন ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত হওয়ার আগে ও পরের দৃশ্য ভিন্ন। এখানে কিছুটা পরিস্থিতির উন্নয়ন দেখা গেছে। বিশেষ করে অগ্নিসংযোগ বা অপহরণের ঘটনা কিছুটা কমেছে।

জানা গেছে, ক্যাম্পে স্বেচ্ছায় পাহারার কারণে এমন উন্নয়ন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এটার কারণে মাঝি বা সাব মাঝি হিসেবে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের টার্গেট করে হত্যা করা হচ্ছে।

আসিফ মুনীর আরও বলেন, এখন রোহিঙ্গাদের মধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি। ক্যাম্পের ভেতরে এপিবিএন, বাইরে পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ে সমন্বয় তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোও জরুরি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন অপরাধে ক্যাম্পের ঘটনায় যে সব মামলা হয় তা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ক্যাম্পের বাইরে পুলিশ সর্বোচ্চ সর্তক রয়েছে। প্রয়োজনে ক্যাম্পের ভেতরে এপিবিএনকেও সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন