আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
মস্কোতে গাড়িবোমা বিস্ফোরণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী আলেকজান্দার দুগিনার মেয়ে দারিয়া দুগিনাকে হত্যার ঘটনায় তার বাবাকেও টার্গেট করা হয়ে থাকতে পারে বলে খবর প্রকাশ করেছে আল-জাজিরা।
তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, ২৯ বছর দুগিনাকে তার টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়িতে পেতে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যা করা হয়।
কে এই দুগিনা?
দুগিনা ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার একজন একনিষ্ঠ সমর্থনকারী ছিলেন। তিনি মৃত্যুর আগপর্যন্ত তার বাবা আলেকজান্ডার দুগিনের উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তাচেতনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। দেশটির জাতীয়তাবাদী টিভি চ্যানেল জারগ্রাদে তিনি রুশ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে কথা বলেন। তবে পর্যবেক্ষকদের মতামত, তিনি সবার কাছে পরিচিত কোনো চরিত্র ছিলেন না।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র দুগিনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। ‘ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি সংস্থার প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি। এ কারণেই তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় দেশটি। যুক্তরাজ্য দুগিনার প্রতিষ্ঠানকে ভুল তথ্য দানকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তার বাবা অখণ্ড রাশিয়ার মতাদর্শী এবং এর জন্য দীর্ঘদিন কাজও করেছেন। রুশ ভাষাভাষী প্রদেশ এবং এলাকাকে তিনি নতুন রুশ সাম্রাজ্য হিসেবে দেখতে চান।
পুতিনের যে নিজস্ব বিশ্বচেতনা রয়েছে এবং ইউক্রেনের প্রতি তার যে দৃষ্টিভঙ্গি, দুগিন সে পথেরই পথিক এবং একজন প্রভাবশালী কণ্ঠ। যদিও রুশ নেতা পুতিনের চিন্তার সঙ্গে তার চিন্তার অমিল নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, তিনি পুতিনের চেয়ে ঢের অনমনীয়।
দুগিনাই কি টার্গেট ছিল?
রুশ সরকার নিয়ন্ত্রিত রসিসকায়া গেজেটা জানায়, হামলার দিন বাবা ও মেয়ে মস্কোর বাইরে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। শেষ সময়ে এসে তারা গাড়ি অদলবদল করেন।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাসকে দুগিনার ঘনিষ্ঠজন এবং রাশিয়ান হরাইজন নামের সামাজিক আন্দোলনের প্রধান আন্দ্রেই ক্রাসনভ জানিয়েছেন, যে গাড়িটিতে বিস্ফোরণ হয়, সে গাড়িতে দুগিনার বাবার ছিল এবং সম্ভবত তাকেই লক্ষ্য করা হয়েছিল।
তবে রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিমিত্রি বাবিচ এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার মতে, হামলার ঘটনার সময় দারয়া দুগিনা তার বাবার চেয়েও বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি বলেন, দুগিন আমার মতে রহস্যঘেরা এক চরিত্র। আমি তাকে সরাসরি পুতিনের সঙ্গে সংযোগ করতে রাজি নই। তবে এই হামলা নিশ্চিতভাবে রুশ জাতীয়তাবাদীদের ওপরই ছিল।’ আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এটা খুব ভালোভাবেই সম্ভব যে দারয়াকেই উদ্দেশ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
হামলার জন্য কে দায়ী
কেজিবির প্রধান উত্তরসূরি রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) জানিয়েছে, এই অপরাধ ইউক্রেনের স্পেশাল সার্ভিস পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করেছে।
তবে কিয়েভে জেলেনস্কির উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলাক এ হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং পুরো বিষয়টিকে বানোয়াট বলেছেন।
এদিকে এফএসবি জানিয়েছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি নাটালিয়া ভভক নামের এক ইউক্রেনীয় নারী এই হামলা চালিয়ে এস্তোনিয়ায় পালিয়ে যান। তিনি ও তার ১২ বছর বয়সী মেয়ে চলতি বছরের জুলাই মাসে রাশিয়ায় আসেন এবং এক মাস ধরে এ হামলার পরিকল্পনা করেন। এর জন্য তিনি দুগিনার জীবনাচরণ সম্বন্ধে জানতে চান এবং একই ব্লকে বাসা ভাড়া নেন।
রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী নজরদারি ক্যামেরায় প্রকাশিত ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, অভিযুক্ত হত্যাকারী ইউক্রেনের আজভ রেজিমেন্টের সদস্য এবং এ সময় ভিডিওতে তার সামরিক আইডি কার্ডও দেখা যায়।
এদিকে রাশিয়ার বিরোধীদলীয় বেশ কয়েক কর্মী মনে করেন, এই হত্যার পরিকল্পনা করেছে দেশটির ভেতরে থাকা কোনো শক্তি, যারা দুগিনের উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং ‘ক্রেমলিন ইউক্রেনের প্রতি বেশি নমনীয় হচ্ছে’ এ-জাতীয় বক্তব্যের বিরোধিতা করে আসছেন।
দুগিনের হত্যা কি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রভাব ফেলবে?
ব্রিটিশ চিন্তা-চৌবাচ্চা রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক শিক্ষক লেখক স্যামুয়েল রামানি বলেছেন, ক্রেমলিনে তাণ্ডব সৃষ্টি হবে যদি এটা কোনো বাহ্যিক হামলা হয়ে থাকে। তবে এটা যদি রুশ নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর অন্তর্গত কোনো ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে হয়ে থাকে, যারা দুগিনের মতো চিন্তককে বাতিল করতে চান, যিনি খুব তাড়াতাড়ি অগ্নিশিখা আর দামামার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে চান, তাহলে এটা নিয়ে খুব একটা মাতামাতি হবে না।
ফরেন পলিসি ইনস্টিটিউটের ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের মধ্য এশিয়া গবেষক ম্যাক্সিমিলিয়ান হেস বলেন, ‘ক্রেমলিন এই হত্যার দ্বিগুণ প্রতিশোধ দেখাবে। আমরা এর আগে দেখেছি কীভাবে ক্রেমলিন প্রতিটি ঘটনায় তেমনটা করেছে।’
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ থেকে অনূদিত।
