হোম আন্তর্জাতিক রান-অফের আগে বলসোনারো-লুলার চরম বাগ্‌যুদ্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

রান-অফ তথা দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে ব্রাজিলের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ও বিরোধী লুইজ ইনাসিও লুলা ডা সিলভার চরম বাগ্‌যুদ্ধ দেখল বিশ্ব। প্রথম দফার ভোটের প্রায় এক মাস পর শুক্রবার (২৮ অক্টোবর) দুই লাতিন নেতার মধ্যে শেষ আনুষ্ঠানিক বিতর্কটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই একে অপরকে তীব্র আক্রমণ করেন তারা।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বলসোনারো ও লুলা একে অপরের চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের রেকর্ড তুলে ধরে কঠোর সমালোচনা করেন। একে অপরের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ করেন। শুধু তাই নয়, একে অপরের প্রশ্নের জবাব দিতেও অস্বীকার করেন তারা।

ব্রাজিলে শ্রমিকদের ন্যূনতম তথা সর্বনিম্ন মজুরি ও বামপন্থি রাজনীতিকদের দুর্নীতির অভিযোগের ইতিহাস প্রশ্নে রীতিমতো একে অপরকে তুলোধুনো করেন বলসোনারো ও লুলা। বামপন্থি হিসেবে পরিচিত লুলা বলেন, ব্রাজিলীয় জানে, কে প্রকৃত মিথ্যাবাদী। অপরদিকে লুলাকে উদ্দেশ করে ডানপন্থি বলসোনারো বলেন, লুলা, আপনি মিথ্যা বলা বন্ধ করুন, বন্ধ করুন।

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ২০০৩ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। শেষ বিতর্কে বলসোনারো সরকারের ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ন্যূনতম মজুরি বাড়ায়নি সরকার। বলসোনারোর দিকে নির্দেশ করে লুলা বলেন, এই ভদ্রলোক চার বছর ধরে সরকার চালাচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এক শতাংশ মজুরিও বাড়ানো হয়নি।

লুলার এ অভিযোগের পরই বলসোনারো তার সরকারের ভুল বুঝতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিশ্রুতি দেন, এবার নির্বাচিত হলে ন্যূনতম মজুরি ২২৯ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৬৫ ডলার করা হবে। যদিও আগামী বছরের বাজেটে ন্যূনতম মজুরির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ওই বাজেট ইতোমধ্যে বলসোনারো নেতৃত্বাধীন জোটের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসে চলে গেছে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটাভুটিতে পিছিয়ে ছিলেন। তবে একই দিনে তার দল দেশটির সিনেট নির্বাচনে বেশ ভালো ফল করেছে। নবনির্বাচিত সিনেট সদস্যদের অনেকেই বলছেন, ৩০ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোটে বলসোনারো হেরে গেলেও দেশের কৃষি খাতে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং ব্রাজিলের কৃষি খাত বামপন্থি প্রার্থী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে।

এটা ছিল বলসোনারো ও লুলার দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বিতর্ক। শুক্রবার (২৮ অক্টোবর) ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিও শহরে টিভি গ্লোবোতে বিতর্কটি অনুষ্ঠিত হয় এবং টানা আড়াই ধরে চলে। চলতি বছরের ২ অক্টোবর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয়।

প্রথম দফার ভোটে কেউ লুলা জয়ী হয়েছেন। লুলা ৪৮.৩ শতাংশ ও বলসোনারো ৪৩.৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। লুলা জয়ী হলেও প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট পাননি। ফলে নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন রান-অফ তথা দ্বিতীয় দফায় গড়ায়। আগামীকাল রোববার (৩০ অক্টোবর) সেই রান-অফ নির্বাচন। আবারও মুখোমুখি হবেন লুলা–বলসোনারো।

দ্বিতীয় দফা ভোটেও লুলাই জিতবেন বলে মনে করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বেশিরভাগ জনমত জরিপই সে কথাই বলছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, প্রথম দফার মধ্য দিয়ে বলসোনারো–যুগের সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু প্রথম দফার ভোটের ফলাফল বলছে, ডানপন্থি বলসোনারো তার জনতুষ্টিবাদী মতবাদকে সুসংহত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এই শক্তিকে ঝেটিয়ে বিদায় করা কঠিন।

জনপ্রিয়তার নিরিখে প্রথম দফার ভোটে লুলার চেয়ে মাত্র ৫ শতাংশ পয়েন্টে পিছিয়ে রয়েছেন বলসোনারো। তাই বলা যায়, আমাজন বন নিধনের মতো নানা বিতর্কের পরও বলসোনারো ভোটারদের কাছে, দেশের মানুষের কাছে এখনও বেশ জনপ্রিয়। এখন ৩০ অক্টোবরের নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান কম থাকলে ব্রাজিলে নির্বাচন–পরবর্তী সংঘাত, হতাহতের ঘটনা ও অনিশ্চয়তা বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কয়েক মাস ধরেই ব্রাজিলে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। নিজের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী বলসোনারো। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, চূড়ান্ত জয় তারই হবে। আর কোনোভাবে যদি জয় পেতে ব্যর্থ হন, তবে তার জন্য দায়ী থাকবে ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং নির্বাচনী ও বিচারিক কর্তৃপক্ষ। যদিও কোনো ধরনের প্রমাণ কিংবা যাচাই ছাড়াই বলসোনারো এ কথা বলেছেন। তবে তার সমর্থকদের ৩০ শতাংশই নিজ দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীন।

লুলার ইমেজও যে একেবারে পরিচ্ছন্ন তা নয়। ক্ষমতায় থাকাকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ছিল বিতর্ক-সমালোচনা। এমনকি দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে বিচার হয়েছে তার। সাজা ভোগ করেছেন।

অন্যদিকে লুলার পরাজয় ঘটলে ব্রাজিলের জনগণের বড় একটি অংশ দেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা হারাবেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। তাদের মতে, ২০০৩ সালে লুলা যখন প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হন, তখন দেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির পথে ছিল। এমনকি অর্থনীতিকে ভালো অবস্থানে রেখেই বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। তার উদারনীতি সমাজব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করেছিল।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানি বাজার চীন। আর সেই বাজারের অন্যতম শীর্ষ সরবরাহকারী ব্রাজিল। আকরিক লোহা থেকে শুরু করে মুরগি—সবকিছুই ব্রাজিল থেকে চীনে রফতানি হয়। এ রফতানি লভ্যাংশের বড় অংশ সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করেছিল লুলা প্রশাসন। তার আট বছরের শাসনামলে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে ৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যের কবল থেকে বেরিয়ে এসেছিল।

এর ঠিক এক যুগ পর এখন পুরোপুরি ভিন্ন এক দেশ বলসোনারোর ব্রাজিল। গত আট বছরে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়েছে। মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে।

যদিও তার শাসনামলের একেবারে শেষ সময়ে এসে গরিব পরিবারগুলোর জন্য অর্থ সহায়তার হাত বাড়ান বলসোনারো। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। ভঙ্গুর অর্থনীতি, রফতানি খাতে দুর্বলতা—করোনা পরবর্তী সময়ে ব্রাজিলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ব্রাজিল সরকারের হিসাবেই, ২০২৩ সালে দেশটির বাজেট ঘাটতি ১ হাজার ২২৫ কোটি ডলারে ঠেকতে পারে। সরকারের পক্ষে সামাজিক কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে দেশটিতে গরিব মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাই বলসোনারোর আমলকে অনেকেই ‘সামাজিক পশ্চাৎপদতার আমল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন