হোম ফিচার মোল্লাহাটের কেন্দুয়া বিলের নিতুল হালদার এর রহস্যজনক মৃত্যু। আত্মহত্যা নাকি হত্যা!

মোল্লাহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি :

বাগেরহাটের মোল্লাহাটে আগা কেন্দুয়া গ্রামের হতদরিদ্র মহানন্দ হালদারের পুত্র নিতুল হালদার(২২) নামের একজন যুবকের মৃত্যুতে ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর কাছে নানা সন্দেহ দানা বাঁধছে। সকলেরই প্রশ্ন আত্মহত্যা নাকি হত্যা!

সরেজমিন পরিদর্শন ও ভূক্তভোগী পরিবারের সাথে কথা বলে জানাগেছে, গত ১৪ এপ্রিল সকাল ৭টার উক্ত গ্রামের মহাসিন শেখ এর বাড়ির কাজের লোক নিতুল হালদার(২২) কে গোয়াল ঘরে কিটনাশক খেয়ে ছটফট করা অবস্থায় মহাসিন শেখ এর স্ত্রী ও তার পুত্রবধু দেখতে পায়। পরবর্তিতে তাদের ডাক চিৎকারে অন্যরা ছুটে এসে নিতুলকে তেতুল গুলিয়ে খাওয়ায় এবং একপর্যায় অবস্থার অবনতি হলে তাকেনৌকায় তুলে পার্শ্ববর্তী ফকিরহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়, সেখানে পৌছানোর পর তাকে ওয়াশ করার পূর্বেই চিকিৎসক জানায় এখানে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। পরবর্তিতে ফকিরহাট থানা পুলিশ এসে একটি অপমৃত্যু মামলা দিয়ে মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য বাগেরহাট সদর হাসপাতালে পাঠায়।

এদিকে ছোট বেলা মাকে হারানো নিতুলের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। বৃদ্ধ বাবা, বড়ভাই, সৎমা, মাসিসহ আত্মীয় স্বজন সবাইই নিতুলের জন্য কান্নাকাটি করছে। সবাই বলছে খুবই ভদ্র, সভ্য শান্ত ও কাজের ছেলে ছিলো নিতুল। এবছর জমি লিজ নিয়ে ধান লাগিয়েছে, ধানের ফলন ও বেশ ভাল হবে বলে মৃত্যুর আগের দিন ও আলোচনা করেছে অনেকের সাথে। তাহলে কেন সে হঠাৎ করে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করতে যাবে? এ প্রশ্নই এখন সবার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। নিতুলের বাড়ি থেকে মহাসিনের বাড়ি বেশী একটা দূর হবেনা। তার ভাইসহ অনেকের কাছে মুঠোফোন রয়েছে, অথচ সকাল থেকে শুরু হওয়া এঘটনার খবরটা সাথে সাথে নিতুলের বাড়ি দেওয়া হয়নী। যখন তাকে মূমুর্ষ অবস্থায় নৌকায় তুলে নদীর মাঝপথে নিয়ে আসে, তখন নিতুলের বাড়ি খবর দেওয়া হয়। নৌকা নিতুলের বাড়ির ঘাটে আসলে সে কথা বলতে পারেনা, কিন্তু তার বড়ভাই নিতাইকে ইশারায় ২আঙ্গুল দেখায় বলে তার ভাই জানায়।তাহলে কি বুঝাতে চেয়েছিলো ঐ ইশারায়!

নিতুলের পরিবার এ ঘটনাকে বলছে ভিন্ন কথা। পরিবারের দাবি, নিতুলকে হত্যা করা হয়েছে। তারা বলছে অভিযুক্ত ব্যক্তি মহাসিন শেখ এবং তার ছেলে জুয়েল শেখ নিতুলকে বেঁধে জোর করে মুখের মধ্যে বিষ ঢেলে দিয়ে তাকে মেরে ফেলেছে । গত ৫ বছরে নিতুলের মালিক মহাসিন শেখ নিতুলের কাজের টাকা বাবদ কোন টাকা পয়সা দেয়নি বলে তার পরিবার জানিয়েছে। নিতুল পাওনা টাকা চাইতে গেলে তাকে সবসময় হুমকি-ধামকি ও ভয় দেখিয়েছে বলে নিতুলের পারিবারিক সূত্র থেকে জানা গেছে। এছাড়া নিতুল মহাসিন শেখের গোয়ালে নিজের দুটো গরু ও পালতো, তার একটা মারা গিয়েছিলো, অন্যটার কোন হদিস নেই।

নিতুলের হত্যার বিষয়ে তার পরিবারের সন্দেহ হলে মোল্লাহাট থানায় একটি অভিযোগ দিতে গিয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অভিযোগ দিতে পারেনী বলে স্থানীয় সাংবাদিকদের তারা জানিয়েছে। মোল্লাহাট থানা পুলিশের ভাষ্যমতে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত এবিষয়ে তাদের আপাতত কিছুই করার নেই। এবিষয়ে ওসি সোমেন দাশ জানান, যেহেতু ফকিরহাট থানায় একই বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে এবং ময়না তদন্ত চলমান রয়েছে তাই রিপোর্ট আশা পর্যন্ত নুতন আর কোন অভিযোগ প্রয়োজন নেই। রিপোর্টে হত্যার আলামত পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

নিতুলের বড়ভাই নিতাই জানায়, তার ভাই ১৩ এপ্রিল রাত সাড়ে আটটার দিকে ৩৯ টাকা রিচার্জ করে দিতে বলে ০১৯৮৭০৪৪৩০১ নাম্বারে, কিন্তু নিতুলের মোবাইল ফোনের ঐ সিমকার্ডটি পরে ভাঙ্গা পাওয়া যায়। এ ছাড়া নিতুলের ব্যবহৃত ০১৯৮৭০৪৪৩০১ নাম্বার এর একটি কল লিষ্টে দেখা যায় যে, নিতুলের ফোনে সেভকরা মহাসিন শেখের মেয়ে মারিয়ার ০১৭৪১২২৬২০৯ নাম্বারে নিতুল গত ১২ এপ্রিল রাত ৩:৪৫ মিনিটে, ৪:১০ মিনিটে, রাত ১০:৪৮মিনিটে, ১৩ এপ্রিল রাত ১০:১০মিনিটে এবং ১৪ এপ্রিল ভোর ৭টায় নিতুল কথা বলে।

উল্লেখ্য মারিয়ার বিয়ে হয়েছে প্রায় ৩মাস। বাগেরহাটে স্বামীর বাড়িতে সে থাকে। সেখান থেকে ১৩ এপ্রিল সে কেন্দুয়া বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে। এবং ১৪এপ্রিল সকাল ৭টায় সর্বশেষ মারিয়ার সাথে ২০ সেকেন্ড কথা হয়। মহাসিন এর পরিবারের ভাষ্যমতে নিতুলের কীটনাশক পানের ঘটনাও সকাল ৭টাই ঘটে। তাহলে কি ছিলো সে ২০ সেকেন্ডের কথা? কেনইবা একজন হিন্দু যুবক একজন মুসলিম সদ্য বিবাহিত গৃহবধুর মোবাইল ফোনে রাত বিরাতে কথা বলছে? এ প্রশ্নই এখন নিতুলের পরিবারের মাঝে সবচেয়ে বেশী ঘুরপাক খাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে তাদের জোরদাবী, মহাসিন শেখের মেয়ে মারিয়া এবং নিতুলের ব্যবহৃত সীমকার্ডগুলো জব্দ করে কল লিষ্টের কথোপকথন থেকে হয়তোবা গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য বের হয়ে আসতে পারে এবং নিতুল হালদারের মৃত্যুর সব প্রশ্নের উত্তর খুজে পেতে পারে, প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচেথাকা কেন্দুয়া বিলে বসবাস করা সহজ সরল জেলে, কৃষক, মৎস্যচাষী, শ্রমজীবী সংখ্যালগু পরিবারগুলো।

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন