জাতীয় ডেস্ক :
এক বা একাধিক মানুষ একটা রিকশায় বসে আছে; আর সেই রিকশা আরেকজন মানুষ প্যাডেল মেরে নিয়ে যাচ্ছে- এমন দৃশ্য যদি একবিংশ শতাব্দীতে এসেও দেখা লাগে তাহলে বিষয়টা কতটা মানবিক দেখায়? অথচ নানারকম উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে আমরা এগিয়ে গেছি বহুদূর। সেই হিসেবে প্রায় শতবর্ষ ধরে চলা এ রিকশার অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন এখনো লক্ষ করা যায়নি।
দীর্ঘ এ সময়ে প্যাডেল থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার রূপান্তরটাই শুধু চোখে পড়েছে। সেটাও অতিরিক্ত গতি ও যথাযথ নিয়মনীতির অভাবে শহরকেন্দ্রিক যানবাহন হিসেবে ধোপে টিকেনি। যদিও রাতে অসংখ্য ব্যাটারিচালিত রিকশার আনাগোনা দেখা যায়। সে ক্ষেত্রেও মানা হয় না কোনো ট্রাফিক রুলস। যত্রতত্র লেনে বেপরোয়া গতিতেই চলে এসব অটোরিকশা। তবে রাজধানীর বাইরে গ্রাম ও মফস্বলে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশাই দেখা যায়। সেক্ষেত্রে রিকশার অনুমোদন নিয়ে থেকে যায় নানা প্রশ্ন।
এদিকে ঢাকা শহরে বৈধ-অবৈধ মিলে এতো সংখ্যক রিকশা অপরিকল্পিত অবস্থায় আছে, যাকে নানারকম সমস্যা, দুর্ঘটনা ও যানজটের কারণ হিসেবেও দেখা হয়। তাহলে এর সমাধান কী? মানবিকতার অবসান ঘটিয়ে এর উন্নত অবকাঠামো সৃষ্টি করে যথাযথ নিয়মনীতির মধ্যে রিকশাকে নিয়ে আসা, নাকি ঢাকা নগরীকে রিকশামুক্ত করা?
আদৌ কি রিকশামুক্ত হবে ঢাকা?
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কারওয়ানবাজার ও বাংলামটোর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কম দূরত্বে যাতাযাতের জন্য প্রধান বাহন হিসেবে রিকশার ব্যাপক চাহিদা ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের মধ্যে। এমন অনেক অলি-গলি আছে যেখানে রিকশার বিকল্প অন্য কোনো যানবাহনও নেই। তাই রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক ছাড়া বাকি অলি-গলিতে রিকশার প্রয়োজনীয়তা লক্ষ করা যায়।
এমনকি ঢাকায় রিকশার ঐতিহ্য ও আধিপত্যের বিস্তার হিসেবে ধানমন্ডির রাপা প্লাজার সামনে মৃণাল হকের ‘ইস্পাতের কান্না’ ভাস্কর্যটি দেখলেই বোঝা যায়। কোনো ভিনদেশি যদি ঢাকা শহরে পা রাখেন, তাহলে যে বিষয়টি তার প্রথমেই চোখে পড়বে- সেটা হলো, তিন চাকার মানবচালিত বাহন রিকশার। কিন্তু আর কতদিন এ রিকশা মানুষ নিজের শক্তি দিয়ে টেনে নিয়ে যাবে?
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এককভাবে বাংলাদেশেই এ রিকশা অন্য যেকোনো বাহনের তুলনায় স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, যা এখন দেশটির ঐতিহ্যের অংশ। এখনও রিকশার প্রসঙ্গ এলে, ঢাকা শহর আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর কারণে ঢাকাকে রিকশার নগরীও বলা হয়। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকাকে রিকশার নগরী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, রিকশা থাকলেও এর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দরকার, যাতে কায়িক শ্রম খরচ করে কোনো মানুষকে কোনো মানুষের টেনে নিয়ে যাওয়া না লাগে। এবং রিকশাকে সঠিক নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে এসে এর সুষ্ঠু ব্যবহার করা দরকার। রিকশামুক্ত ঢাকা শহর খুবই কঠিন একটি বিষয়। তবে এতো বিপুল সংখ্যক রিকশারও প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করেন অনেকে।
রাজধানীতে কত সংখ্যক রিকশা আছে
বিশ্বের অনেক দেশে রিকশার ব্যবহার উঠে গেলেও বাংলাদেশে দিন দিন এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে। বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ১২ লাখ রিকশা চলাচল করছে বলে এক জরিপে জানা গেছে। ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুল সংখ্যক রিকশার মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে মাত্র ২ লাখ ১২ হাজার ৯৯৭টি রিকশার।
এদিকে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ বা বিলসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ১১ লাখের মতো। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ঢাকায় বৈধ অবৈধ মিলে প্রায় ১৫ লাখ রিকশা চলাচল করছে। আর পুরো দেশে কত সংখ্যক রিকশা চলাচল করছে, সেটার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কারও জানা নেই।
কী বলছেন যাত্রীরা
রিকশামুক্ত নগরী নাকি অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে রিকশার ব্যবহার করা প্রসঙ্গে ফাতিমা পিয়া নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমার বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব অনুযায়ী আমাকে রিকশায় যেতে হয়। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে রিকশাই একমাত্র যানবাহন। তাই রিকশার প্রয়োজনীয়তা আছে, তবে অনেক সময় বৃদ্ধ ও রুগ্ন এমন কিছু মানুষকে দেখি রিকশা চালাচ্ছে। তাদের কষ্ট দেখে মনে হয় এমন কোনো কিছু আসা উচিত যাতে তাদের কষ্ট করতে না হয়।
হাসান নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, কিছু কিছু জায়গায় রিকশা ছাড়া যাতায়াত করা সম্ভব হয় না। আবার সঙ্গে যদি মা-বাবা কিংবা ছোট কোনো ভাই-বোন থাকে তাহলে তাদের নিয়ে সহজেই রিকশায় যাওয়া যায়। তবে যারা একা চলাচল করেন তারা সাইকেল ব্যবহার করতে পারেন। এক্ষেত্রে সমস্যা হলো, সবাই তো আর সাইকেল চালাতে পারেন না। এ ছাড়া উবার বা পাঠাও ব্যবহার করার পর্যাপ্ত টাকাও অনেকের কাছে থাকে না। তাই রিকশা এসব ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় একটি যানবাহন।
বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করা হাসান ফারুক নামে এক পথচারী বলেন, আমাদের রাস্তার সিস্টেমই তো ঠিক নেই। নেই কোনো পার্কিং সুবিধা। তাই মাঝে মাঝে রিকশা নিয়েও জ্যামে পড়তে হয়। অপরিকল্পিত ও ভাঙা রাস্তার কারণে এ তীব্র গরমে যারা রিকশা চালান তাদের মাঝে মাঝে খুব খারাপ অবস্থা হয়ে যায়। আগে রাস্তা ও সিস্টেম ঠিক করতে হবে। তবেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
কী বলছে সিটি করপোরেশন
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বলছে, রিকশা নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার উদ্যোগ নেয়া হলেও এর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সবশেষ উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে। সে সময় ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি গঠন করে ঢাকা শহরের রিকশা নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। হাতেগোনা কয়েকটি প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও রাজধানীর প্রায় সব সড়কেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রিকশা। নগরীর প্রতিটি অলিগলি, মহাসড়ক এমনকি ভিআইপি রোড- কোনোটিতেই রিকশার চলাচল বাদ নেই। এ বিষয়ে প্রশাসনের তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই।
অনেকেই ঢাকা শহর থেকে রিকশা উঠিয়ে দেয়ার কথা বললেও বিলস-এর পরিচালক কোহিনুর মাহমুদ বলেন, রিকশা মূলত দুই শিফটে চলে। সেই হিসাবে (বিলসের তথ্যমতে) এর চালকের সংখ্যা আনুমানিক ২২ লাখের মতো। তাই রাজধানীতে রিকশা বন্ধের আগে এ বিশাল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য বিকল্প ভাবা দরকার। কেননা, যে কোনো শ্রমজীবী মানুষকেই, তার পেশা থেকে সরিয়ে নিতে হলে তাকে সময় দিতে হবে। তার জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, অনেকেই যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং করেন। এতে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে গুলশান-বনানীতে পরীক্ষামূলকভাবে ৫০০ গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য অন স্ট্রিট স্মার্ট পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া আগের অনিবন্ধিত রিকশা তুলে দিয়ে নতুন করে কিউআর কোডযুক্ত ২ লাখ রিকশা নিবন্ধন দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
রিকশার ভবিষ্যত কী?
রিকশার মতো ধীরগতির যানকে ঢাকায় যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। এ কারণে ঢাকার অনেক প্রধান সড়ক থেকে রিকশা সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ বাহনটির ওপর একটি বিশাল জনগোষ্ঠী নির্ভরশীল থাকায় রিকশা পুরোপুরি তুলে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার এই সময়ে এসে মানুষ মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তা-ও মানবিক দেখায় না। তাহলে রিকশার ভবিষ্যত কী?
এ বিষয়ে শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুহিত হাসান বলেন, ঢাকা শহরের বেশিরভাগ রিকশাচালক গ্রাম থেকে আসা। বেশি লাভের আসায় তারা শহরে আসেন। এরা মূলত খণ্ডকালীন রিকশাচালক। এক্ষেত্রে তাদের শহরমুখী না করে, গ্রামেই কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো। এতে শহরে চাপ কমবে। তাছাড়া আমাদের আবার গ্রামীণ অর্থনীতিতে ফিরে যেতে হবে। তারা যেন গ্রামেই কাজ করতে পারেন সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আর বাকিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়মমাফিক শহরের যেসব জায়গায় রিকশার প্রয়োজন সেখানে চালানোর অনুমতি দিয়ে কাজ করাতে হবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাহমুদ সজল বলেন, রিকশা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। রিকশা ছাড়া ঢাকাকে কল্পনা করা যায় না। তবে এটাও ঠিক যে তথ্য প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় রিকশার অবকাঠামোগত পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। কেননা একজন মানুষ আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তা আমার কাছে অমানবিক মনে হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশার সঠিক নিয়ম, প্রশিক্ষণ ও স্পিড লিমিট নির্ধারণ করে তা আবার চালু করা উচিত। এমনকি দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের রিকশার উন্নত টেকনোলজি নিয়ে কাজ করা উচিত, যাতে তাদের কায়িক শ্রম খরচ করে প্যাডেল মেরে রিকশা চালাতে না হয়।
