হোম আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ভারতের ‘মহাপরিকল্পনা’, নেপথ্যে কী?

বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ভারতের ‘মহাপরিকল্পনা’, নেপথ্যে কী?

কর্তৃক Editor
০ মন্তব্য 40 ভিউজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাকি দেশকে সংযুক্ত করে রেখেছে যে সরু ভূখণ্ড, যেটা চিকেন নেক বা শিলিগুড়ি করিডর নামেও পরিচিত। সেখানে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ কেটে রেললাইন বসানোর পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে ভারত। অন্যদিকে আসামে, ব্রহ্মপুত্র নদের নিচ দিয়েও সুদীর্ঘ এক সুড়ঙ্গপথের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে ভারত সরকার।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার তিন মাইল হাট থেকে শিলিগুড়ি শহর হয়ে ১১ কিলোমিটার দূরের রাঙাপাণি পর্যন্ত প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে রেললাইন বসানো হবে।

ভারতের উত্তর পূর্ব রেলওয়ের মুখপাত্র কপিঞ্জল কিশোর শর্মা বলছেন, প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো আসেনি।

তবে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেটের পরে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রকল্পটির বিষয়ে প্রথম জানিয়েছিলেন। তাই এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা।

ভূ-কৌশলগতভাবে ভারতের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই চিকেন নেক বা শিলিগুড়ি করিডোর। এই অংশটি গড়ে মাত্র কুড়ি কিলোমিটার চওড়া। পাশেই বাংলাদেশ। আবার উত্তরের দিকে আছে চীন, পশ্চিমে নেপাল।

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ এই চিকেন নেক করিডোর। যাত্রী, পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই চিকেন্স নেক করিডোরই ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যাত্রী পরিবহন করা হলেও ভূগর্ভস্থ এই নতুন রেললাইনের সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম।

আবার গত ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে এক বৈঠকে অর্থনৈতিক বিষয়সমূহের ক্যাবিনেট কমিটি একটি পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়েছে, যেটিতে আসামে ব্রহ্মপুত্র নদের নিচ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এমন একটি সুড়ঙ্গ পথ বানানো হবে, যেখানে ট্রেন আর গাড়ি দুই-ই চলাচল করতে পারবে।

ভারতের বহু শহরেই এখন ভূগর্ভস্থ রেলপথ বা মেট্রো রেল চলে। কিন্তু সেগুলো শুধুই শহরাঞ্চলের গণপরিবহণ ব্যবস্থা হিসেবে রয়েছে। চিকেন্স নেক করিডোরে যে ভূগর্ভস্থ রেলপথ বসবে, সেটা যাবে সম্পূর্ণই গ্রামীণ এলাকার মধ্যে দিয়ে।

রেল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এরকম প্রকল্প ভারতীয় রেল এর আগে নেয়নি – যেখানে তিনটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি সুদীর্ঘ সুড়ঙ্গ কেটে রেললাইন পাতা হবে। ভারতীয় রেলওয়েজের এই অঞ্চলটি উত্তর-পূর্ব রেলের অধীন। তারাই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।

উত্তর পূর্ব রেলের মুখ জনসংযোগ আধিকারিক কপিঞ্জল কিশোর শর্মা বলেন, উত্তর দিনাজপুরের তিন মাইল হাট থেকে শুরু হয়ে এই রেলপথ শিলিগুড়ির কাছে রাঙ্গাপাণি হয়ে বাগডোগরা পর্যন্ত যাবে। মোট ৩৫.৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ রেলপথে দুটি পৃথক সুড়ঙ্গ থাকবে।

ঘটনাচক্রে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি যে তিনটি নতুন সেনা ঘাঁটি বানাচ্ছে, তার মধ্যে দুটি– বিহারের কিশানগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের চোপড়ার খুব কাছাকাছি দিয়েই যাবে প্রস্তাবিত ভূগর্ভস্থ রেলপথটি। তৃতীয় সেনা ঘাঁটিটি হচ্ছে আসামের ধুবড়িতে।

এ ছাড়াও মাটির ওপর দিয়ে যে দুই লাইনের রেলপথ ইতিমধ্যেই আছে, সেটিকে চার লাইনের রেলপথে পরিবর্তিত করা হবে।

কপিলঞ্জল কিশোর শর্মা বলেন, ভূগর্ভস্থ রেলপথটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে নিরাপদে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির যোগাযোগ তো ওই প্রায় ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ করিডোর দিয়েই।

‘টানেল বোরিং মেশিন’ দিয়ে সমান্তরাল দুটি সুড়ঙ্গ কাটা হবে। সুড়ঙ্গ তৈরি করতে যেমন ব্যবহৃত হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, তেমনই থাকবে অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও।

নেপাল, ভুটান আর বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে এই করিডোরের খুব কাছে। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাধা বিপত্তিও থাকে, সেদিক থেকে মাটির নিচ দিয়ে এই রেলপথ অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সুরক্ষিত এবং অ-দৃশ্যমান এই পথ দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সেনা, সামরিক সরঞ্জাম আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো যাবে। আবার এই রেললাইনের কাছেই বাগডোগরা বিমান ঘাঁটি ও ব্যাঙডুবিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৩ কোরের সেনাছাউনি অবস্থিত, তাই রেল-বিমান সংযোগেও সহায়তা করবে এই রেলপথ, বলছিলেন কপিঞ্জল কিশোর শর্মা।

তার কথায়, প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে আনুমানিক ১২ হাজার কোটি ভারতীয় টাকা। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে বোঝা যাবে ঠিক কত অর্থ দেওয়া হলো প্রকল্পটির জন্য। আমরা আশা করছি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়ে যাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি।

কেন গুরুত্ব সামরিক পরিবহনের ওপরে?

উত্তর-পূর্ব রেলওয়ের মুখপাত্র কপিঞ্জল কিশোর শর্মা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, নতুন ভূগর্ভস্থ রেলপথ দিয়ে শুধুই সামরিক সরঞ্জাম বা সেনা সদস্যরা যাতায়াত করবেন না, সাধারণ যাত্রী ট্রেনও যাবে এই পথ দিয়ে।

তবে একই সঙ্গে তিনি বারবার গুরুত্ব দিচ্ছিলেন সেনা সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে এই ভূগর্ভস্থ রেলপথের কৌশলগত দিক থেকে কত গুরুত্ব, তার ওপরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকেন্স নেক করিডোর সবসময়েই ভারতের কাছে সামরিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার প্রবীর সান্যাল বলেন, আমি যখন সত্তরের দশকের শেষ দিকে সিকিমে পোস্টেড ছিলাম, তখন আমাদের আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি হিসেবে পরিকল্পনা করা থাকতো যে চীন যদি ভুটান হয়ে আমাদের শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন্স নেকে আক্রমণ চালায় তাহলে আমরা কী করব! এখন তো আবার মাঝে মাঝে বাংলাদেশের কারা সব হাস্যকর হুমকি দেয় শুনি যে তারা নাকি চিকেন্স নেক দখল করে নেবে!

তবে আমাদের সতর্ক তো থাকতেই হবে। এখন যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ রেলপথের, সেটা অনেক আগে, অন্তত ২০ বছর আগেই করা উচিত ছিল। ওই অঞ্চল মাটির নিচে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে সেনা সদস্যদের আর সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের সুবিধাটা হবে, যে কোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষিপ্ত হলেও এই উত্তর পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না শত্রু দেশ– এতটাই মোটা কংক্রিট দিয়ে বানানো হবে সুড়ঙ্গ, বলছিলেন ব্রিগেডিয়ার সান্যাল।

কৌশলগত বিষয়ের বিশ্লেষক প্রতীম রঞ্জন বসু বলেন, এখন ভারত যেকোনো অবকাঠামোগত পরিকল্পনাই করছে, সেসময়ে মাথায় রাখা হচ্ছে সামরিক পরিবহনের ওপরে। যত টানেল হচ্ছে ভারতে, সব ক্ষেত্রেই এমনভাবে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে যাতে সৈন্য বাহিনী অন্তত ৩০ দিন ওই সব সুড়ঙ্গে ভেতরে অবস্থান করতে পারে, আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

“চিকেন নেক অঞ্চল দিয়েই আবার বিদ্যুৎ, পরিবহনের লাইন, ইন্টারনেট কেবল, তেল আর গ্যাসের পাইপলাইন গেছে। তাই চাইলেই মাটির ওপর দিয়ে নতুন রেলপথ তৈরি করা কঠিন। আবার এটা জনবহুল অঞ্চলও”।

অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ রেলপথ গড়া হলে তা এতটাই সুরক্ষিত থাকবে, মোটা কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করা হবে যে মাটির ওপরে কোনো ধরনের বাধা তৈরি বা আক্রমণ হলেও মাটির নিচে নিরবচ্ছিন্নভাবে যাতায়াত চালু থাকবে। যাত্রী পরিবহণকারী ট্রেন চললেও চিকেন্স নেক করিডোর সামরিক দিক থেকেই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বলেন বসু।

ভারতের অর্থনৈতিক বিষয়সমূহের ক্যাবিনেট কমিটি ১৪ ফেব্রুয়ারি এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে আসামে, ব্রহ্মপুত্র নদের নিচ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, চার লেনের দুটি সমান্তরাল সুড়ঙ্গ তৈরি করা হবে।

এই দুটি সমান্তরাল সুড়ঙ্গের একটি দিয়ে ট্রেন চলবে, অন্যটি থাকবে গাড়ি চলাচলের জন্য। ট্রেন পথে, গোহপুর, অন্যদিকে নুমালিগড় যুক্ত হবে।

সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে নুমালিগড় আর গোহপুরের মধ্যে ২৪০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে প্রায় ছয় ঘন্টা সময় লাগে। এই সমস্যার সমাধান করতে “প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুযায়ী গোহপুর থেকে নুমালিগড়ের মধ্যে চার লেনের একটি নিয়ন্ত্রিত সংযোগ ব্যবস্থা” গড়া হবে, যেখানে ব্রহ্মপুত্র নদের নিচ দিয়ে রেল এবং সড়ক সুড়ঙ্গও থাকবে।

এটিই হবে ভারতের প্রথম ভুগর্ভস্থ রেল ও সড়ক সুড়ঙ্গ, বলা হয়েছে ওই বিবৃতিতে। বিশ্বে আর একটি এরকম ‘রেল-সড়ক সুড়ঙ্গ’ আছে। এই প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য ৩৩.৭ কিলোমিটার, আর তার মধ্যে ১৫.৭৯ কিলোমিটার সুড়ঙ্গ তৈরি হবে ব্রহ্মপুত্রের নিচ দিয়ে।

বলা হচ্ছে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে কৌশলগত এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই সড়ক-সুড়ঙ্গ। অন্তর্দেশীয় জলপথের বিশ্বনাথ ঘাট আর তেজপুরকেও সংযুক্ত করবে নতুন এই সড়ক।

আবার একদিকে আসামের তেজপুর ও অরুণাচল প্রদেশের ইটানগর বিমানবন্দরগুলির সঙ্গেও সংযোগ থাকবে এই নতুন সংযোগ ব্যবস্থায়। তেজপুরের ভারতীয় বিমান বাহিনীর ঘাঁটিটি চীন সীমান্তে রণকৌশলের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিমান ঘাঁটিতে ভারতের সুকোই যুদ্ধবিমানের একটি বহর রয়েছে।

এ বছরের জানুয়ারি মাসে বিমান ঘাঁটিটি আরও প্রশস্ত করার জন্য প্রায় ৩৮৩ একর জমি অধিগ্রহণ করার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে সরকার। তথ্যসূত্র- বিবিসি

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন