জাতীয় ডেস্ক :
দেশের তরুণরা একদিন সফল এবং সার্থক মানুষ হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে, তুলে ধরবে সারা বিশ্বে। এখন সময় এসেছে তরুণদের স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের। আর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সব সময় তাদের পাশে থাকবে সরকার। এমন মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন একাডেমির প্রকল্প-আইডিয়া আয়োজিত বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্র্যান্ট (বিগ) ২০২১- এর গ্র্যান্ড ফিনালে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী আশা করেন, এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ীরাই একদিন গুগল, টেসলা, আমাজনের মতো বিশাল কোম্পানিতে পরিণত হবে। মুজিব জন্মশতবর্ষে ‘বঙ্গবন্ধু ইননোভেশন গ্র্যান্ট ২০২১’ আয়োজনে প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৫৭টি দেশ থেকে ৭ হাজারের অধিক উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও স্টার্টআপের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, বাংলাদেশ আজ আইসিটি খাতে সারা বিশ্বে একটি বিশ্বাসের জায়গা করে নিয়েছে।
দেশি ও বিদেশি স্টার্টআপদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন উদ্ভাবন বা উদ্ভাবনী স্টার্টআপ খুজেঁ বের করতে, আইডিয়া প্রকল্প তরুণ উদ্যোক্তা অর্থাৎ স্টার্টআপদের নতুন উদ্ভাবনী ধারণাকে উৎসাহিত করে দেশে একটি সঠিক স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়তে ভূমিকা রাখবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক। প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্টার্টআপ পলিসি তৈরির কাজে হাত দিয়েছে সরকার। যেটি করা গেলে তথ্য প্রযুক্তির নতুন উদ্যোক্তারা অনেক সহজেই তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেন।
‘বিগ-২০২১’ প্রতিযোগিতায় প্রাথমিক পর্যায়ে দেশ-বিদেশ থেকে ৭ হাজারেরও বেশি স্টার্টআপ আবেদন করে, যেখান থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৫৬টি দেশ থেকে মোট ২৫৫টি প্রকল্প গৃহিত হয়। সেখান থেকে দুই দফায় বাছাই শেষে নির্বাচন করা হয় সেরা ১০টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের স্টার্টআপ, যারা সরাসরি অংশ নেয় গ্র্যান্ড ফিনালেতে।
অপরদিকে, দেশীয় পর্যায়ে স্টার্টআপ বাছাই হয় প্রাথমিকভাবে দুই দফায়। প্রথম পর্যায়ে ২৮ জন বিচারক ৫টি স্ক্রিনিং বোর্ডের মাধ্যমে বাছাই করেন ২৮৬টি দেশীয় স্টার্টআপ। সরকারি-বেসরকারি ৩৫ জন অভিজ্ঞ বিচারক ৬টি প্যানেলে বিভক্ত হয়ে এই স্টার্টআপগুলো থেকে বেছে নেন সেরা ৬৫টি স্টার্টআপ, যারা ৬ দিনব্যাপী অনলাইন বুট ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। বুট ক্যাম্পে গ্রুমিং শেষে এই ৬৫টি স্টার্টআপ নিয়েই শুরু হয় ১৩ পর্বের টিভি রিয়েলিটি শো।
এ পর্বে প্রতিযোগীরা মুখোমুখি হন দেশের প্রতিষ্ঠিত বিজনেস আইকনদের, যারা বিচারক হিসেবে উপস্থিত থেকে বাছাইকৃত ৬৫ স্টার্টআপ থেকে ২৬টি স্টার্টআপ নির্বাচন করেন। রিয়েলিটি শো থেকে নির্বাচিত ২৬টি দেশীয় স্টার্টআপ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সেরা ১০টি স্টার্টআপ এবং আইডিয়া প্রকল্পের পোর্টফোলিও স্টার্টআপের সেরা ১০টিসহ মোট ৪৬টি স্টার্টআপকে নিয়ে হয় ‘বিগ ২০২১’- এর চূড়ান্ত বাছাই প্রক্রিয়া।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ফেসবুক, উবার, এয়ার-বিএনবি, টুইটার, লিঙ্কড-ইন, টেসলা বা ড্রপবক্সের মতো মার্কিন প্রধান প্রযুক্তি সংস্থাগুলো তাদের কোনোটিই ২০ বছর আগে ছিল না, এমনকি গুগল মাত্র ২১ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজকের দিনে এসব কোম্পানি মাত্র কয়েক বছরে শত শত বিলিয়ন, এমনকি ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। ই-কমার্স জগতের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান শুধু অ্যামাজনই ঘণ্টায় আড়াই মিলিয়ন ডলার নিট প্রফিট করে, যা সত্যি অবিশ্বাস্য। বিশ্বের বৃহত্তম মিডিয়া সংস্থা ফেসবুক তাদের বেতনভুক্ত কোনো সাংবাদিক বা কন্টেন্ট নির্মাতা নেই। বিশ্বের বৃহত্তম ট্যাক্সি কোম্পানি উবার, একটিও ট্যাক্সির মালিক নয়। এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সার্ভিস সেক্টরে বিপ্লব ঘটিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী অনেক কোম্পানির বাজার দখল করে নিয়েছে শুধু তারুণ্যের বুদ্ধি-বৃত্তিক উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশে ২ হাজার ৫০০ টির বেশি স্টার্টআপ কাজ করছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। দেশে বর্তমানে ৪০ টিরও বেশি এক্সেলেরেটর এবং ইনকিউবেটর প্রোগ্রাম তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু স্টার্টআপ দেশে প্রচুর বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে, যা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। স্টার্টআপদের মাধ্যমে ১৫ লাখের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ‘বিগ ২০২১’ আয়োজন, এমন একটি উদ্যোগ যা স্টার্টআপ সংস্কৃতি গঠন ও উন্নয়নের বর্তমান সরকারের অঙ্গিকারের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
তিনি আশা করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই তারুণ্যের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে আবির্ভূত হবে।
এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সচিব এন এম জিয়াউল আলম পিএএ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)- এর নির্বাহী পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব ড. মো. আব্দুল মান্নান, পিএএ । অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইডিয়া প্রকল্পের পরিচালক ও যু্গ্মসচিব মো. আব্দুর রাকিব।
তরুণ উদ্যোক্তা অর্থাৎ স্টার্টআপদের অনুপ্রাণিত করতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতায় বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের অধীনে ‘উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন একাডেমি প্রতিষ্ঠাকরণ প্রকল্প (আইডিইএ)’ আয়োজন করে ‘বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্র্যান্ট (বিগ) ২০২১’। এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য হলো- তরুণ উদ্যোক্তা অর্থাৎ স্টার্টআপদের উদ্ভাবনী ধারণাকে উৎসাহিত করে দেশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক এই আয়োজনে ১৪২টি দেশে ক্যাম্পেইন শেষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৫৭টি দেশ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ৭ হাজারের অধিক স্টার্টআপ ও উদ্ভাবক এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করে। মুজিববর্ষে স্টার্টআপদের জন্য আইসিটি বিভাগের সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে সেরাদের সেরা একটি স্টার্টআপ ‘ওয়ান বিগ উইনার ২০২১’ হিসেবে পাচ্ছে এক লাখ ইউএস ডলার অনুদান। এছাড়া, দেশীয় স্টার্টআপদের নিয়ে অনুষ্ঠিত রিয়েলিটি শো-এর থেকে নির্বাচিত ২৬ টি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সেরা ১০টি স্টার্টআপ অর্থাৎ দেশি-বিদেশি নির্বাচিত মোট ৩৬ টি স্টার্টআপের প্রত্যেকেই পাচ্ছে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার অনুদান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষে এই বিশেষ আয়োজনের গ্র্যান্ড ফিনালে রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মাল্টিপারপাস অডিটরিয়ামে শনিবার (৩০ অক্টোবর) সকালে অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় তিন ঘণ্টার জমকালো একটি অ্যাওয়ার্ড বিতরণী অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় ‘বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্র্যান্ট (বিগ) ২০২১’- এর এবারের আসর।
রিয়েলিটি শো থেকে পাওয়া সেরা ২৬ স্টার্টআপ:
টিঙ্কারস টেকনোলজিস লিমিটেড, বণ্টন কানেক্ট, র্যা ডেসিস্ট, বইঘর, অলওয়েল বিডি লিমিটেড, ল্যান্ডনক লিমিটেড, ইনোভেইস টেকনোলজিস, লাইফস্প্রিং কন্সালটেন্সি লিমিটেড, আইডিয়া থ্রি ডি সলিউশনস, ক্যাপ্টেন আর্থ, ওপেনরিফ্যাক্টরি, আপস্কিল, সাইকিওর অর্গানাইজেশন, প্লাস্টাইল, ব্রেইলি টেক লিমিটেড, ইনক্লুশন এক্স, স্মার্ট হোয়াইট কেইন, ডিঙ্গি টেকনোলজিস লিমিটেড, ঘোস্ট কিচেন বাংলাদেশ, অ্যান্টস এরিয়াল সিস্টেমস, আলো, সাইনটিকো ডট কম, খেলবেই বাংলাদেশ, জোবাইক, অনলাইন সহপাঠী, রোবোল্যাব
আন্তর্জাতিক সেরা ১০টি স্টার্টআপ:
থার্মো নর্থ, মাই ক্যাশ মানি পিটিই লিমিটেড, এগ্রোভিজিও, ইঙ্ক স্পায়ার্ড, ডব্লিউটিম, সোসো কেয়ার, গ্র্যান্ট মাস্টার, বায়ো মেক, ইভরেকা, কেয়ার ফর্ম ল্যাবস প্রাইভেট লিমিটেড।
আইডিয়া প্রকল্পের সেরা ১০টি স্টার্টআপ:
অল্টারইয়ুথ, অক্সিজেট, ব্লাডম্যান, ভূমিজো লিমিটেড, জাহাজি লিমিটেড, বাইক লক, দ্যা টু আওয়ারস্ জব, গারবেজম্যান লিমিটেড, অভিযাত্রিক, স্বাধীন মিউজিক।
