আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীই ক্ষমতার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। দেশটির ৭৪ বছরের ইতিহাসে সব প্রধানমন্ত্রীকেই মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের ক্ষমতাচ্যুতির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে দেশটির সেনাবাহিনী।
সাবেক ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী বনে যাওয়া ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শিবির। ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম প্রধান মিত্র মুত্তাহিদা কউমি মুভমেন্ট-পাকিস্তান এমকিউএম-পি জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হলেন। এরমধ্য দিয়ে পাকিস্তানের কলঙ্কিত ইতিহাসে নাম লেখালেন তিনি।
পাকিস্তানের ৭৪ বছরের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রী-ই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। বিশৃঙ্খলা, সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অথবা সামরিক অভ্যুত্থান, সবশেষ অনাস্থা ভোটের কারণে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের ক্ষমতাচ্যুতির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে দেশটির সেনাবাহিনী।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর দায়িত্ব পালনের সময়কাল কখনোই সুখকর হয়নি। দেশটির সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের কারণে তখন থেকে অন্তত চারটি বেসামরিক সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে। ১৯৫০ সালের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের সংবিধান স্থগিত করেন এবং ১৯৫৮ সালে দেশটিতে মার্শাল ল জারি করেন।
মার্শাল ল জারির ১৩ বছর পর জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৭৩ সালে বিশেষ ব্যবস্থায় সংবিধান পাশের পর তিনি প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন।
১৯৭৭ সালে পাকিস্তানের নির্বাচনে জয় লাভ করেন ভুট্টো। একই বছর দেশটিতে জেনারেল জিয়া-উল-হকের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন ভুট্টো। ১৯৮৮ সালে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে জেনারেল জিয়া-উল-হকের মৃত্যুর পর জুলফিকার আলী ভুট্টোর মেয়ে বেনজির ভুট্টো হন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তার শাসনকাল মাত্র তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল। ১৯৯০ সালে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দেওয়ায় জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয়। ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বেনজির ভুট্টোও।
সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং পাকিস্তানের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেনজির ভুট্টোর স্থলাভিষিক্ত হন নওয়াজ শরিফ। সামরিক বাহিনীর চাপের মুখে ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয় তাকেও। ওই বছরের এক নির্বাচনে আবারো দেশ শাসনের সুযোগ পান বেনজির ভুট্টো। কিন্তু তার এই মেয়াদ ব্যাপক দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে পরিপূর্ণ ছিল।
১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ফারুক লেঘারি জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়ায় বেনজির ভুট্টোকে আবারও ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির সাধারণ নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ পিএমএল-এন জয় পায়। কিন্তু ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মুশাররফ দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করে নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি পিপিপি জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং ইউসুফ রাজা গিলানি দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে আদালত অবমাননার একটি মামলায় গিলানি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত তার মেয়াদ বেশ মসৃণভাবেই চলছিল। পরে তার ক্ষমতার বাকি মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন রাজা পারভেজ আশরাফ।
২০১৩ সালে আবারও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন নওয়াজ শরিফ। কিন্তু পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি মামলা দায়ের হওয়ায় তার ক্ষমতার মেয়াদ কমিয়ে আনা হয়। ২০১৭ সালে নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। পরে মেয়াদের বাকি সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন শহীদ খোকন আব্বাসি।
২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ইমরান খান। সাবেক এই ক্রিকেট তারকার প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসার পেছনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্যাপক সমর্থন ছিল বলে বিভিন্ন মহলের বিশ্বাস। যদিও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং ভুল পররাষ্ট্রনীতির কারণে ব্যাপক সংকটের মুখোমুখি পাকিস্তান।
