জাতীয় ডেস্ক :
মোঘল আমলের ধোলাইখাল এখন শুধু নামেই খাল। আদতে সুপ্রাচীন ধোলাইখাল পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত পরিণত হয়েছে মোটর গাড়ির যন্ত্রাংশের বিশাল বাজারে।
ধোলাইখালের বাসিন্দাদের সকালের ঘুমটা ভাঙে গাড়ি ভাঙার শব্দে। প্রচলিত আছে, ধোলাই খালের কর্মীরা সর্বোচ্চ আধাঘণ্টার মধ্যে একটি গাড়ির সব যন্ত্রাংশ খুলে ফেলতে পারেন।
যন্ত্রাংশ খোলার এমন দক্ষ হাত যাদের, তারা কী কেবলই ভাঙতে আর খুলতে জানেন? তাদের দ্বারা কী গড়ে তোলা সম্ভব নয়?
সময় সংবাদের এমন প্রশ্নের উত্তরে ধোলাইখালের কয়েকজন টেকনিশিয়ান সর্গবে বলেন, ‘আমরা যেমনি গাড়ির পার্টস খুলে আলাদা করতে পারি, তেমনি আমাদের সুযোগ দিলে পার্টস জোড়া লাগিয়ে গাড়িও বানাতে পারব।’
ধোলাইখালের হাজী মনসুর মার্কেট ও বাঁশপট্টি মার্কেটের কয়েকজন টেকনিশিয়ানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা শুধু সেকেন্ড হ্যান্ড যন্ত্রপাতি কেনেন না, নিজেরাও বানান। এখানে অনেকেই আছেন যারা ৩০-৪০ বছর ধরে কাজ করছেন। গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরি ও খোলায় এরা সিদ্ধহস্ত।
গাড়ির যন্ত্রাংশ যাদের কাছে শিশুর খেলনার মতোই সহজ, তারা সক্ষমতা থাকার পরও কেন গাড়ি বানাচ্ছেন না- এমন প্রশ্নে মোহম্মদ মাসুম নামে এক টেকনিশিয়ান বলেন, ‘ভাই আমাদের দেশে গাড়ির বডি বানায় না। ধোলাইখালে সব পাবেন, শুধু বডি পাবেন না।’
মাসুম আরও বলেন, ‘তবুও আমাদের যদি সুযোগ দেয়া হয় আমরা গাড়ি বানিয়ে দেখিয়ে দিতে পারব। আমি ২৫ বছর ধরে এ লাইনে আছি। আমি জানি কয়েকটি ভালো পদক্ষেপ নিলেই আমরা নিজেরাই সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি বানাতে পারব। এমনকি ছোট ছোট ইস্পাতের টুকরা দিয়ে আমরা গাড়ির বডিও বানাতে পারব।’
মাসুম যে একটুও বাড়িয়ে বলেননি এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় পরিসংখ্যানেই। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিইআইওএ) দেয়া তথ্যমতে, খোদ ধোলাইখালে তৈরি হয় হাজার খানেক যন্ত্রপাতি। স্থানীয় অনেক কারিগর আছেন যাদের নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। কিন্তু তাদের কাজ এতটাই নিখুঁত যে, দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানও ধোলাইখাল থেকে নিজেদের যন্ত্রাংশ বানিয়ে থাকে। দেশের গাড়ির যন্ত্রাংশের ২০ শতাংশ আসে ধোলাইখাল থেকে। আর সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির যন্ত্রাংশের ৮০ শতাংশ আসে এই বাজার থেকে- এমনটাই বলছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
ধোলাইখালে যন্ত্রাংশের দাম দেশের যেকোনো স্থানের চেয়ে অনেক কম। ধোলাইখালে এমনও অনেক মেশিন তৈরি হয়, যা আমদানি করতে খরচ পড়ে ৪-৫ কোটি টাকা। আর ধোলাইখাল থেকে বানিয়ে নিলে একই মেশিনের দাম দাঁড়ায় ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা।
গাড়ির যন্ত্রাংশের দাম নিয়ে টং মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আফসার উদ্দিন সময় সংবাদকে বলেন, ‘মনে করেন এইখানে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড স্টিয়ারিংয়ের দাম ৮-১০ হাজার টাকা। এখন এইটা লাগালেই কিন্তু আরামছে গাড়ি বছর দশেক চলবে। এবার ধইরা নিলাম ধোলাইখাল বইলা কিছু নাই। তাইলে এই স্টিয়ারিং নষ্ট হইলে বাইরে থেকে এইটা আনতে দাম পড়ব ৭০ হাজার টাকা। এইবার বুঝেন, ধোলাইখাল না থাকলে বাংলাদেশের মোটর ব্যবসা জায়গার ওপরে অচল।’
