জাতীয় ডেস্ক :
একদিকে সন্তান হারানোর শোকে কাতর বাবা-মা ও পরিবার, অপরদিকে ঘর পোড়ানোর নির্মমতায় ঠিকানাহীন অর্ধশত পরিবার। সব মিলিয়ে পুরো গ্রামে চলছে শোকের মাতম।
বুধবার (২৫ জানুয়ারি) সকালে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার খোদাদাপুর গ্রামে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে মিম ও রাকিব নামে দুই যুবক নিহত হয়। বৃহস্পতিবার (২৬ জানুয়ারি) জোহরের নামাজ শেষে নিজ গ্রামে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
দাফনপর্ব শেষ হলেও প্রিয় সন্তান হারানো বাবা-মায়ের মনে জমে আছে শোকের মেঘ। কথা বেরোনোর আগেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তারা। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানান, এ ব্যথা বয়ে বেড়ানো সহজ নয়। প্রতি মুহূর্তেই ওই মুখগুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে।
এদিকে নিহতের ঘটনার পরপরই বিক্ষুব্ধ জনতা প্রতিপক্ষের বাড়িতে ভাঙচুর করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কয়েকশ জনতা একে একে প্রায় অর্ধশত বাড়িতে আগুন দেয়। করা হয় ভাঙচুর ও লুটপাট। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় এসব বাড়িঘরে থাকা আসবাব, টিভি, ফ্রিজ, মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য জিনিসপত্র।
ঘর হারানো মানুষগুলোর এখন রাত কাটছে খোলা আকাশের নিচে। ছোট শিশুদের নিয়ে নানান দরজায় ঘুরেও মেলেনি একটু আশ্রয়। অনেকের মুখে জোটেনি ক্ষুধার অন্ন। এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
ভুক্তভোগী রহিমা বেগম বলেন, ‘গত রাতে ভুট্টার জমিতে লুকিয়ে ছিলাম। এক দিন হয়ে যাচ্ছে পেটে কোনো খাবার পড়েনি।’
আরেক নারী তাহমিনা বেগম বলেন, ‘রাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছি একটি রাতের আশ্রয়ের জন্য। কেউ আমাদের থাকতে দেয়নি। রাস্তাঘাটে ঘুরেফিরে রাত পার করেছি।’
কুদ্দুস মিয়া নামে আরেকজন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের লোকজন আমাদের কাছে আসেনি। একমুঠো খাবার কেউ দেয়নি। স্ত্রী ও ছোট্ট দুটি সন্তান নিয়ে কাল থেকে না খেয়ে আছি।’
এ অগ্নিতাণ্ডবে খোদ ফায়ার সার্ভিসকে শঙ্কায় ফেলে দিয়েছিল। বাসিন্দাদের অসহযোগিতা ও পানির স্বল্পতায় ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েন। এ ছাড়া ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অকল্পনীয়। এখনও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ইনচার্জ নিরঞ্জন সরকার বলেন, ‘গ্রামবাসীর বাধা ও আশপাশের পানির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আগুন নেভাতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছিল। এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখন বলা সম্ভব নয়। তদন্ত সাপেক্ষে এটি বলা যাবে।’
এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বুধবার রাতে নিহত মিমের বাবা হায়দার আলী বাদী হয়ে পাঁচজনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। একই দিন অভিযুক্ত উপজেলার চুনিয়াপাড়া গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে ওমর আলী (৫৫), তার স্ত্রী মোমেতা বেগম (৪৫) এবং তার ছেলে সামিরুল ইসলামকে (২০) গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রামবাসীর আক্রমণে আহত হওয়ায় পুলিশ হেফাজতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে তাদের দিনাজপুর জেলা কারাগারে পাঠায় পুলিশ।
এদিকে বৃহস্পতিবার ভোরে এ মামলার আরেক আসামি একই এলাকার আজাহার আলী মণ্ডলকে (৬৩) রংপুর থেকে গ্রেফতার করে র্যাব।
ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু হাসান কবির বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উপস্থিত হই। অল্প সময়ের মধ্যে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।’
