হোম এক্সক্লুসিভ তামিম ইকবাল: ভয়ডরহীন তরুণের কিংবদন্তি হয়ে ওঠা

খেলাধূলা ডেস্ক:

১৭ মার্চ ২০০৭ সাল; জন্মদিনের ঠিক তিনদিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পোর্ট অব স্পেনে ১৭ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণ বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামলেন। ভারতের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলে সবাইকে মুগ্ধ করলেন তিনি। ডাউন দ্য উইকেটে এসে জহির খানের ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির বল তিনি অনায়াসে পাঠালেন গ্যালারিতে। বিশ্ব ক্রিকেটের ‘মিনোস’ বাংলাদেশের এক ব্যাটারের এমন দুঃসাহসিক কাজ দেখেই বিশ্ব বুঝে গিয়েছিল, এই ছেলে হারিয়ে যেতে আসেনি।

সেই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৫৩ বলে ৫১ রান করে আউট হয়ে যান সেই তরুণ। এর আগের বিশ্বকাপে কানাডার কাছে হার মানা বাংলাদেশ তারুণ্যের শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে সে ম্যাচে হারিয়ে দেয় হট ফেবারিট ভারতকে। এরপর প্রথমবারের মতো সুপার এইটেও খেলে বাংলাদেশ। নজর কাড়া সেই তরুণ বিশ্বকাপে আর তেমন কিছু করে দেখাতে না পারলেও সে ম্যাচেই নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। রাজসিকভাবে নিজের আগমন জানান দেয়া সেই তরুণই পরবর্তীতে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল।

তামিমের দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা অবশ্য বিশ্বকাপ দিয়ে নয়। হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে মাত্র ৫ রান করেছিলেন তামিম। আয়ারল্যান্ডের বলে ব্রেন্টের হাতে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন তিনি। টাইগাররা অবশ্য সেদিন হারিয়েছিল জিম্বাবুয়েকে। একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বাংলাদেশের অভিষেক টি-টোয়েন্টি দিয়েই অভিষেক হয় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও।

টেস্ট অভিষেকের জন্য অবশ্য পরের বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় তামিমকে। ২০০৮ সালের জানুয়ারির চার তারিখে নিউজিল্যান্ডের ডুনেডিনের ইউনিভার্সিটি ওভাল মাঠে টেস্ট অভিষেক হয় তামিমের। বাংলাদেশ সেই টেস্টে সহজেই হেরে গেলেও তামিমের শুরুটা হয় রাজসিক। নিউজিল্যান্ডের প্রতিকূল পরিবেশে ১৮ বছরের এই দুই ইনিংসেই দলের পক্ষে সেরা পারফর্মার হন। প্রথম ইনিংসে ৫৩ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসেই সেঞ্চুরি প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত থামেন ৮৪ রান করে।

এরপর অবশ্য খেই হারিয়েছেন, কিন্তু ফিরেছেন ভয়ঙ্কর সুন্দর ব্যাটিংয়ে। একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে এশিয়া কাপের টানা চার ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি করে তামিমের রাজসিক প্রত্যাবর্তন, প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে লর্ডসে টেস্ট সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে অনার্স বোর্ডে নাম লেখানো কিংবা ম্যানচেস্টারে পরের ম্যাচেই সেঞ্চুরি করে তাক লাগিয়ে দেয়ার কীর্তি তো বাংলাদেশের ক্রিকেট রূপকথার অংশ।

ক্রিকেটার হিসেবে তামিমের কীর্তি কম নয়। বাংলাদেশের পক্ষে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে সর্বোচ্চ রান তারই। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১৫ হাজারের বেশি রান করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলেছেন তিনি। বাংলাদেশের পক্ষে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২৫টি সেঞ্চুরিও তামিমের। ওয়ানডেতে তামিমের ১৪ সেঞ্চুরিই কোনো বাংলাদেশির ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ড। একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে তিন ফরম্যাটেই সেঞ্চুরি হাঁকানোর কৃতিত্বও তামিমেরই। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে কমপক্ষে তিনবার ২টি করে সেঞ্চুরি হাঁকানো একমাত্র ক্রিকেটারও তিনিই।

২০১১ সালে ক্রিকেটের বাইবেল খ্যাত উইসডেন অ্যালম্যানাকের বর্ষসেরা চার ক্রিকেটারের একজন তামিম। একই বছর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে উইসডেনের বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটার নির্বাচিত হন এই বাঁহাতি।

২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ২৯৫ রান করে আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন তামিম। তিন ফরম্যাটের মধ্যে সবার আগে টি-টোয়েন্টিকেই বিদায় বলেছেন তামিম। ২০২২ সালে টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর গ্রহণের আগে ৭৮ ম্যাচ খেলে ২৪.০৮ গড়ে ১৭৫৮ রান করেছেন তামিম। একটি সেঞ্চুরি ছাড়াও হাঁকিয়েছেন ৭টি হাফ সেঞ্চুরি।

টি-টোয়েন্টির তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল তামিম ওয়ানডে ও টেস্টে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে পর্যন্ত ২৪১টি ওয়ানডে খেলে ৩৬.৬২ গড়ে ৮৩১৩ রান করেছেন তামিম। এশিয়ারই অন্যতম সেরা ওপেনার তামিম ১৪টি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন ওয়ানডেতে, আছে ৫৬টি হাফ সেঞ্চুরিও। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৫৮ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংসটাই ওয়ানডেতে তার সর্বোচ্চ। ২০২০ সালে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব পান তামিম। তখন থেকে অবসরের ঘোষণা দেয়ার আগ পর্যন্ত অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন এই বাঁহাতি।

টেস্টেও বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের মালিক তামিম। ৭০ টেস্টে ১৩৪ ইনিংসে ৩৮.৮৯ গড়ে ৫১৩৪ রান করেছেন তিনি। ১০টি সেঞ্চুরির পাশাপাশি হাঁকিয়েছেন ৩১টি হাফ সেঞ্চুরি। সর্বোচ্চ ২০৬ রানের ইনিংসটি ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেছিলেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও ঘরোয়া ক্রিকেট চালিয়ে যাবেন তামিম। খেলবেন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগেও।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন