হোম অন্যান্যমতামত তাঁরা পোশাক শ্রমিক, ফুটবল নয়

তাঁরা পোশাক শ্রমিক, ফুটবল নয়

কর্তৃক
০ মন্তব্য 138 ভিউজ

অনলাইন ডেস্ক :

গলির মোড়ের ছোট্ট ফটো স্টুডিওর সামনে হঠাৎ লোকজনের জটলা। এই করোনা দিনে এমন জটলা দেখা সত্যিই আতঙ্কজনক। একটু কাছে গিয়েই জানতে পারলাম, তারা সবাই গার্মেন্টস শ্রমিক। এসেছেন পাসপোর্ট সাইজ ছবি তুলতে; কারণ গার্মেন্টসের মালিকের নির্ধারিত ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা লাগবে, তবেই মিলবে বেতন।

রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থছাড় জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই সাপেক্ষে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীদের দেওয়া হবে। অথচ শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টই নেই, এতদিন গার্মেন্টসগুলো বেতন দিত স্লিপের মাধ্যমে।

পোশাক শ্রমিকদের গত রবিবার (৫ এপ্রিল) কাজে যোগ দিতে বলে ছিলো মালিকরা ৷ আর কাজে যোগ না দিলে তারা বেতন পাবেন না- এটাই ছিল অনেকক্ষেত্রে মূল নির্দেশনা৷ তাই সবাই ট্রাকে, পায়ে হেঁটে বা যে কোনো উপায়ে ঢাকা, সাভার ও গাজীপুরে ফিরে আসেন৷ কিন্তু রবিবার সকালে কারখানায় গিয়ে তারা জানতে পারেন ১২ তারিখ পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে৷ কারখানার গেট বন্ধ।

তাঁরা পোশাক শ্রমিক, ফুটবল নয়
পোশাক শ্রমিক জেসমিন বলে, ‘রবিবার ভোরে এসেছি। বাসায় ঢুকতে পারিনি। বাড়িওয়ালা বলেছেন, তোমরা করোনা আক্রান্ত কি-না জানি না। বাসায় ঢুকতে না পেরে গার্মেন্টসে চলে আসি। আধা বেলা কাজ করিয়ে আমাদের বলা হয়- ১২ তারিখ পর্যন্ত ছুটি। কবে বেতন দেবে তাও জানায়নি৷ আমার বাড়ি বরিশাল। রাতটা কোনোরকমে এক জায়গায় কাটিয়েছি, এখন কি করবো জানি না।’

লকডাউনে এই কর্মহীন শ্রমিকদের বাড়ি ফেরা এবং কারখানায় আবার কাজে যোগ দিতে হুরমুর করে রাজধানীতে ফেরা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা তুমুল সমালোচনায় মুখর হয়েছিলাম। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ব্যয়বহুল এই শহরে বেতনহীন দিন কাটানো অনেক কষ্টের। আর গাদাগাদি করে ১০ ফুট বাই ১০ ফুট ঘরে অবস্থান করে, শত জনে এক বাথরুম আর শ’দুয়েক জনের রান্নাঘরে কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনের আশা আমরা কিভাবে করি? মূলত আমরা ভদ্রসমাজ জানিই না যে, এই শহরে ওদের ঘর নেই, আছে শুধু মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই ৷

ওরা ফিরে আসে, কারণ ওদের শুধু বাঁচলেই হবে না- বাঁচাতে হবে মূল্যবান চাকরিখানাও৷ পেতে হবে শ্রমের দাম৷ আর তাদের এই আসা-যাওয়ার কলকাঠি নাড়েন এসিরুমে বসা কর্তাব্যক্তিরা। তারাই গণ পরিবহন খোলা রেখে পুরো দেশ বন্ধের ঘোষণা দিয়ে তাদের ঢাকা ছাড়তে দেন; আবার চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে পায়ে হাঁটিয়ে ঢাকায় ফেরান।

গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ আর সেনাবাহিনী কঠোর হচ্ছে৷ কারণ চলতি দুই সপ্তাহ নাকি সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার৷ প্রশ্ন হলো, তাহলে গার্মেন্টস কর্মীদের কি সংক্রমণের ভয় নেই, ওরা কী করোনাজয়ী? বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেছিলেন, ‘যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েই যাদের অর্ডার আছে তারা কারখানা খোলা রাখতে পারবেন৷’ কিন্তু এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে কারখানা মালিকদের কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আছে তা বলে গেলেন না।

কারখানায় না হয় মালিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেন, কিন্তু শ্রমিকরা গ্রাম থেকে যে প্রক্রিয়ায় ফিরছেন, সেখানে কি স্বাস্থ্য ঝুঁকি নেই? কাজের পর তারা যে বাসস্থানটিতে ফিরবেন, সেখানকার ঝুঁকি মুক্ত করবেন কী করে? শ্রমিকরা কারখানায় যাওয়া-আসা করতে হয়তো গণ পরিবহন ব্যবহার করবেন বা হেঁটে যাবেন। সেখানে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারবেন কতটা? এই বিষয়গুলো বিজিএমইএ প্রথমেই ভাবলে আজকে এই পরিস্থিতি দাঁড়াত না।

তাঁরা পোশাক শ্রমিক, ফুটবল নয়

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, ‘আজকে মালিকরা শ্রমিকদের বেতন দিতে পারে না। ছুটি দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর টাকা দেওয়ার ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করে, তারপর তারা বন্ধের ঘোষণা দেন। অথচ আজকে ৪০ বছরের এই সেক্টরের শ্রমিকদের দিয়েই গার্মেন্টস মালিকরা মন্ত্রী এমপি হয়েছেন; প্লেন, ব্যাংক, টেলিভিশনের মালিক হয়েছেন।

আর শ্রমিকরা বেতন পায় না! পাশের দেশ ভারত, শ্রীলংকা ও নেপালে লকডাউনে মালিকরা কিভাবে শ্রমিকদের রক্ষা করছে তা দেখে আমাদের শেখা উচিত। আমরা দেশের অর্থনীতিতে ৭৬% বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশটাকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করেছি। কিন্তু এই গার্মেন্টস মালিকরাই আমাদের মানুষ হিসেবে মানে না। সরকারি কর্মকর্তা, ধনীদের জন্য লকডাউন আর আমাদের জন্য শুধু কাজ কাজ কাজ।’

তাঁরা পোশাক শ্রমিক, ফুটবল নয়

এদিকে সিদ্ধান্তের এই দোলাচল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বইতে শুরু করে সমালোচনার ঝড়। এক সংবাদমাধ্যম কর্মী লিখেছেন, ‘করোনায় এ কেমন তামাশা! এই যাওয়া-আসার মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের বিস্তৃতি ঘটানোর আয়োজন করেছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।’

৫ এপ্রিল গার্মেন্টস খুলে দেওয়া প্রসঙ্গে এক অর্থনীতিবিদ সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘আমাদের সবার জীবন হুমকিতে ফেলা হলো। এর মানে কী? বুঝলাম ব্যবসা নষ্ট হবে, বায়ার/ব্র্যান্ডের সাথে আপনার সম্পর্ক নষ্ট হবে, আপনার লাভের আয় হবে না, দেশের রপ্তানি আয় কম হবে, প্রবৃদ্ধি কম হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু, এখন কি সেসব বিবেচনার অবস্থায় আমরা আছি? প্লিজ, বলবেন না যে, ফ্যাক্টরি না খুললে শ্রমিকের বেতন দিতে পারবেন না। অর্ডার বাতিল হয়েছে মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলারের। গত বছর মোট পোশাকের ৩৪ বিলিয়ন ডলার রফতানির হিসেব করলে ১০ শতাংশ অর্ডারও তো বাতিল হয়নি। সব ফ্যাক্টরির অর্ডার বাতিল হয়নি, কিছু অর্ডার বাতিল হয়েছে।’

তাঁরা পোশাক শ্রমিক, ফুটবল নয়

আবার ১২ তারিখ পর্যন্ত গার্মেন্টস বন্ধের ঘোষণায় এক চিকিৎসক লিখেছেন, ‘গাধা পানি খায়, একটু ঘোলা করে।’ এরকম আরও হাজার হাজার স্ট্যাটাসে ভরে উঠেছে ফেসবুক।

এই অল্প সময়ে স্বল্প মুনাফা লাভের আশায় সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার মতো এই সিদ্ধান্তগুলো আত্মঘাতী। এই দূর্যোগদিনে পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে এই ফুটবল খেলা না খেললেও হতো। কোনো কারণে দেশে করোনায় আক্রান্ত সংখ্যা বেড়ে গেলে সেটা কাটিয়ে ওঠার শক্তি আমাদের নেই- এই সহজ হিসাব বুঝতে হবে। আর এটাও মনে রাখতে হবে, এই শ্রমিকরা তাদের পরিবারের একমাত্র অর্থ যোগানদাতা। অতএব, তারা আক্রান্ত হওয়া মানে পুরো বাংলাদেশ আর্থিকভাবে আক্রান্ত হওয়া।

এভাবে ঘর থেকে বের করে মাঝপথে আবার ঘরে ফিরে যেতে বলাটা পলিসি লেভেলের সিদ্ধান্তহীনতার প্রমাণ রাখে। যা নাগরিকদের জীবনে অস্বস্তিই তৈরি করে, যা কোনো যুক্তিতেই নির্ভরতা কিংবা বিশ্বস্ততার নয়। হয়তো এই উদাহরণ আমাদের ভবিষ্যতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখনই শ্রমিকদের করোনা মুক্ত সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করুন, নয়তো ঘরে থাকা নিশ্চিত করুন।

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন