হোম অন্যান্যসারাদেশ ঢাকার মেট্রোযাত্রা: কষ্টের ফল মিঠাই হয়!

জাতীয় ডেস্ক :

দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল বুধবার (২৮ ডিসেম্বর) উদ্বোধন হচ্ছে। উদ্বোধনের পরদিনই জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হবে এ স্বপ্নের বাহন। মেট্রোরেল নিয়ে রাজধানীবাসীর আগ্রহ এখন তুঙ্গে।

ঢাকার রাস্তা মানেই বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে ঝুলে অফিসে যাওয়া, একইভাবে বাসায় ফেরা। প্রতিদিন আয়োজন করে ঘণ্টাখানেক সময় অপচয়ের প্রস্তুতি নিয়ে রাজধানীবাসীকে রওনা দিতে হয় গন্তব্যস্থলে। যেখানে মতিঝিল থেকে উত্তরা যেতে ক্ষেত্রবিশেষ সময় লাগত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, একই রাস্তা এখন মেট্রোরেলে পাড়ি দেয়া যাবে মাত্র ২০ মিনিটে। ঢাকাবাসীর কাছে এ এক বিস্ময় ছাড়া আপাতত কিছুই নয়।

এ বিষয়ে মতিঝিল ব্যাংকপাড়ার বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মঈনুল হাসান সময় সংবাদকে বলেন, ‘আমার বাসা শেওড়াপাড়া। ওখান থেকে প্রতিদিন অফিসে আসতে কয়েক ঘণ্টা সময় অপচয় হয়। মেট্রোরেল চালু হলে বাসে আসার আর প্রশ্নই ওঠে না। যদিও শুরুতে স্বল্প পরিসরে মেট্রোরেল যাত্রা শুরু করছে, তবে আশা করি শিগগিরই পুরোদমে চালু হবে এটি। তখন আর মতিঝিল থেকে মিরপুর যেতে বেগ পেতে হবে না।’

মেট্রোরেল নিয়ে কথা হয় মিরপুরের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে। তাদের মধ্যে পেশায় ব্যবসায়ী হাসিবুর রহমান বলেন, “ভাই, সবচেয়ে বেশি কষ্ট করছি আমরা। এমনিতেই এ এলাকায় জ্যামের শেষ নাই। এর মধ্যে দশ বছর ধইরা যখন মেট্রোরেলের কাজ শুরু হইলো, তখন একদিকে গেল জ্যাম বাইড়্যা, অন্যদিকে ধুলা-ময়লার তো ইয়ত্তা নাই। তয় কথায় আছে না: সবরের ফল মিঠা হয়, আমাগো সেই মিঠা ফলের নাম ‘মেট্রোরেল’।”

মতিঝিলের আরামবাগে কথা হয় নটর ডেম কলেজের ছাত্র সাদিক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘খুব জলদি মতিঝিলের লাইনটাও চালু করে দেয়া দরকার। এখন বাসে আসা-যাওয়া করলে যে কষ্টটা হয়, মেট্রোরেল চালু হলে এটা কমে যাবে। এখন কলেজে এসে বাসায় গিয়ে আর পড়াশোনার শক্তি থাকে না। মেট্রোরেল চালু হলে দুই ঘণ্টার যাতায়াত কমে হবে আধঘণ্টার। তখন সময় বাঁচবে, পড়াশোনা করার মতো এনার্জিও থাকবে।’

মেট্রোরেলে ছাত্রদের বিশেষ ছাড়ের দাবি জানিয়ে ফার্মগেট এলাকার কয়েকজন ছাত্র একই সুরে বলেন, ‘বাসে যেমন হাফ পাস নেয়া হয়, মেট্রোরেলেও তেমনি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা আমাদের জন্য অনেক বেশি হয় যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত শিক্ষার্থীদের জন্য নমনীয় হওয়া।’

ক্ষেত্রবিশেষে মেট্রোরেলে ছাড়ের প্রসঙ্গে সম্প্রতি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ভাড়া হবে ১০০ টাকা। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাড়া মওকুফ থাকবে। মেট্রোরেলে মাসিক, সাপ্তাহিক, পারিবারিক এবং কার্ডে ভাড়া দেয়ার বিশেষ সুবিধা থাকবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রতিবার ভ্রমণে বিশেষ ছাড় পাবেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের কথা জিজ্ঞাসা করলে মন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

মেট্রোরেল একটি উন্নত বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থার স্মারক উল্লেখ করে লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশি সাফিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘বিদেশে যখন মেট্রোরেল দেখতাম, তখন আফসোস হতো: আহারে! আমার দেশেও যদি এমন একটা ব্যবস্থা থাকত। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টোকিও এমনকি দিল্লির মতো শহরগুলো মেট্রোপলিটনে পরিণত হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে ওদের মেট্রোরেল। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না হলে কখনোই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আশা করা যায় না। আগেরবার যখন ঢাকায় এসেছিলাম, তখন কাজ সবেমাত্র শুরু হয়েছিল। সে সময় মনে একটা শঙ্কা ছিল–এত বড় একটা প্রজেক্ট আদৌ ১৫-২০ বছরে শেষ হবে তো। এবার এসে দেখি কাজ এক রকম শেষই বলা যায়। আমি হলফ করে বলতে পারি, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মেট্রোরেল ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব এনে দিতে সক্ষম।’

মেট্রোরেল নিয়ে প্রশংসা করতে গিয়ে ৯ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের দেশ দিয়েছেন, স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, আর তার মেয়ে দেশটাকে সাজিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। দেশ গড়ার কথা সব রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে আছে, কিন্তু করে দেখিয়েছেন একমাত্র শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতুর সময় মানুষ বলেছিল: যেই গভীর নদী, ওর ওপর সেতু হবে না। অনেকে বলেছে, সেতু বানাতে গেলে সব টাকা খরচ করে বাংলাদেশকে ভিক্ষা করে খেতে হবে। কই সেতু তো হলো, দেশও ঠিক আছে। পদ্মা সেতু যেমন চাক্ষুষ একটি উন্নয়ন, মেট্রোরেলও তেমনি। হাতিরঝিল কিংবা কুড়িল-মৌচাকের ফ্লাইওভার যেমনি ঢাকার চেহারা বদলে দিয়েছে, মেট্রোরেল তেমনি পুরো রাজধানীর চেহারাই বদলে দেবে এবার। এমনসব মেগা প্রজেক্ট করতে টাকার চেয়েও যেটা বেশি দরকার সেটা হলো সাহস। বঙ্গবন্ধুকন্যার সেই সাহস আছে। পদ্মা সেতুর পর মেট্রোরেল বানিয়ে আবার সেটার প্রমাণ দিলেন তিনি।’

২৮ ডিসেম্বর ঢাকায় প্রথমবারের মতো উদ্বোধন হচ্ছে মেট্রোরেল। এরই মধ্যে উদ্বোধন সামনে রেখে চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ ও সাজ সাজ রব। প্রথম ধাপে ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মেট্রোরেল যাবে আগারগাঁও হয়ে উত্তরা পর্যন্ত। ২০২৩ সালে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল ও ২০২৫ সালে মতিঝিল থেকে কমলাপুর হয়ে পুরো রুটে চালু হবে মেট্রোরেল প্রকল্প। ঢাকার মেট্রোযাত্রা শতবছরের এ শহরকে একেবারে নতুনরূপে সাজাবে বলে মনে করছেন নগরবাসী। অপেক্ষা মাত্র আর কয়েক ঘণ্টার, এরপরই শুরু হবে ঢাকার মেট্রোযাত্রা।

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন