জাতীয় ডেস্ক :
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অসহায় শিকার বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। আজ থেকে ১২-১২ বছর আগে বাংলাদেশে পার ক্যাপিটা পার এরিয়া গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন ছিল শূন্য দশমিক ২ টন। এখন সেটা একটু বেড়েছে। কারণ আমাদের শিল্প-কারখানা বেড়েছে। মানুষের সক্ষমতা বেড়েছে। আগে মানুষ এসি কম ব্যবহার করতেন, এখন বেশি ব্যবহার করেন। সারা দেশ বিদ্যুতায়িত হয়েছে। এসব কারণে গ্রিন হাউস গ্যাস একটু বেড়েছে। কিন্তু তা সামান্য। এখন তা শূন্য দশমিক ৬ টন।
রোববার (৬ নভেম্বর) বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরামের সঙ্গে কপ২৭-পূর্ব মতবিনিময় ও সমসাময়িক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার সময় এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী।
বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নত দেশগুলোই দায়ী বলে মনে করেন হাছান মাহমুদ। তিনি জানান, উন্নত দেশগুলোতে জনপ্রতি গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন অনেক বেশি। ইউরোপে পার ক্যাপিটা পার এরিয়া ১০ টনের বেশি। আমেরিকায় ১৫ টন বা আরও বেশি। দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পার ক্যাপিটা পার এরিয়া এখন চার-পাঁচ টন গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হচ্ছে। সেই তুলনায় আমাদের কিছুই না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সেটি আমাদের ওপর অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি হচ্ছে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সব বিরূপ প্রভাব দৃশ্যমান। যেমন, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। যারা উপকূলের মানুষ, তারা জানেন, আমি চট্টগ্রাম শহরের ছেলে, সেই কারণে আমিও জানি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, হঠাৎ একদিনে অনেক বৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনাগুলো অনেক বেড়ে গেছে। অর্থাৎ ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু সম্পর্কিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
একই সঙ্গে হিমালয়ের বরফগলাও বেড়েছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, যে কারণে প্রকৃতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হিমলায়ের বরফ গলার কারণে সেখানে গ্ল্যাসিয়াল লেক তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সেই লেকগুলো হিমালয়ের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায়। দুটো টেকটোনিক প্লেটের মার্জারের পরিপ্রেক্ষিতে হিমালয় তৈরি হয়েছে। যেখানে দুটো টেকটোনিক প্লেট মার্জ করে, সেখানে সবসময় ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্প হওয়ার শঙ্কা থাকে। সেখানে যদি ভূমিকম্পের কারণে এই গ্ল্যাসিয়েল লেক তৈরি হয়, তাতে বড় দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।
হাছান মাহমুদ আরও বলেন, গ্ল্যাসিয়েল লেক বলতে বরফগলে যে লেকগুলো তৈরি হয়েছে, সেটাকে বোঝায়। সেখান থেকে উৎপত্তি হওয়া নদীগুলো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। তাহলে সেটার যে কী বিরূপ প্রভাব, তা অনুমানেরও বাইরে। সবমিলিয়ে আমরা এই জলবায়ু পরিবর্তনের অসহায় শিকার। পুরো পৃথিবীই শিকার।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষার পরিবর্তে মানুষ যুদ্ধে ব্যস্ত বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। তথ্যমন্ত্রী বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, পৃথিবীর মানুষ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার পরিবর্তে এখন কে ন্যাটোতে যুক্ত হবে, কে হবে না, সেটি নিয়েই ব্যস্ত। আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত, একে অপরকে ধ্বংস করতে ব্যস্ত, একে অপরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পাল্টা-নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ব্যস্ত, ধীরে ধীরে যে পুরো মানবজাতি একটি মহাদুর্যোগ অতিক্রম করছে, সেই দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেই মানবজাতির অস্তিত্ব যে হুমকির মুখে, সেটি নিয়ে মাথাব্যথা খুবই কম।
এবারের কপ২৭ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, আমাদের এবারকার বক্তব্য থাকবে, যে দয়া করে যুদ্ধটা বন্ধ করুন। একে অপরকে ধ্বংস করার পরিবর্তে সবাই মিলে পৃথিবীটাকে রক্ষা করি। এটি প্রথম বক্তব্য, দ্বিতীয় বক্তব্যটা হচ্ছে, আমরা যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের অসহায় শিকার, আমরা বহু বছর থেকে বলে আসছি, সেটির পুনরাবৃত্তি আমরা করব যে কোনো অজুহাত এখানে দাঁড় করানো যাবে না। আমাদের প্রতিশ্রুত সাহায্য করতে হবে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্যারিস চুক্তির আলোকে যেগুলো হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো এখনও হয়নি। যেমন, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে যে পরিমাণ অর্থ জমা পড়ার কথা ছিল সেটি জমেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কমিয়ে আনতে সেই অর্থ সমবণ্টনের কথা ছিল, কিন্তু তা কার্যকর হচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি যেভাবে সমাধান করার কথা ছিল, সেভাবে হচ্ছে না।
তিনি জানান, আমাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে আমরা চেষ্টা করব, আমরা যারা পৃথিবীতে শান্তি চাই, শান্তি স্থাপিত হোক। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে পৃথিবী নানা অশান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই যে আড়াই বছর ধরে মহামারি। এরমধ্যে আমরা যুদ্ধ করছি। আমাদের বিবেক-বুদ্ধি কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মহামারির মধ্যে পৃথিবীর অর্থনৈতিক অবস্থা নড়বড়ে হয়েছে। কিন্তু আমরা ব্যস্ত নিষেধাজ্ঞা পাল্টা-নিষেধাজ্ঞায়। এতে ডলার শক্তিশালী হয়েছে, পাশাপাশি রুবলও। কিন্তু আমরা যারা যুদ্ধের বাইরে আছি, আমরা প্রচণ্ড অর্থনৈতিক সংকট অতিক্রম করছি। যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু মহামারি না, এ বছর দেখেন, বিভিন্ন দেশে বন্যা, খরা ও দাবানল হয়েছে। ইউরোপ, তুর্কি, গ্রিস, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি মাঝে মাঝে সাইবেরিয়ায়। আমরা ছোটবেলায় পড়েছি, বরফের দেশ সাইবেরিয়ায় এক্সিমোরা থাকে। সেই সাইবেরিয়ায়ও দাবানল হচ্ছে। এই যে পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। পৃথিবী যে একটি প্রাকৃতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এসব ঘটনার তারই বহিঃপ্রকাশ।
এখন থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা দরকার বলে মনে করেন মন্ত্রী। তার মতে, আমাদের জলবায়ু সচেতনতা প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি আছে। যদিও সাধারণ মানুষকে অতটা সম্পৃক্ত করতে পারিনি। কিন্তু যা আছে, তার পেছনে সাংবাদিকদের অবদান আছে।
