জাতীয় ডেস্ক :
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা বাংলাদেশকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে টানতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকা সফর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিশেষ উপদেষ্টা রিয়ার অ্যাডমিরাল এইলিন লউবেখার। এদিকে শনিবার (১৪ জানুয়ারি) বাংলাদেশে আসেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। তবে এর মধ্যেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশে ‘যাত্রাবিরতি’ নিয়ে হচ্ছে ব্যাপক আলোচনা।
হঠাৎ কেন ঢাকায় আসলেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী? এ জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের ঢাকা সফরের সময়টিকে কেন বেছে নিলেন তিনি? কী ছিল এর পেছনের কূটনৈতিক উদ্দেশ্য-এমন নানা প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। আর এসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে মার্কিন সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার (১১ জানুয়ারি) ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বছরের প্রথম কূটনৈতিক সফরে চীন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আফ্রিকায় পাঠিয়ে আসছে টানা ৩২ বছর ধরে। ২০২৩ সালেও সেই ধারা অব্যাহত রাখতে ৯ থেকে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ইথিওপিয়া, গ্যাবন, অ্যাঙ্গোলা, বেনিন, মিশর, আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দফতর ও আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রধান কার্যালয়ে সফর নির্ধারিত ছিল দেশটির নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিন গ্যাংয়ের। কিন্তু ইথিওপিয়ায় পৌঁছানোর আগে ‘আশ্চর্যজনকভাবে’ বাংলাদেশে যাত্রাবিরতি করেন শিন।
গত সোমবার (৯ জানুয়ারি) মধ্যরাতে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বহনকারী উড়োজাহাজ হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সময় বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এরপর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে বৈঠক হয়।
মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে ‘টেকনিক্যাল স্টপওভার’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, ‘বৈঠকে দুই পক্ষ চীন-বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করেছে এবং নতুন বছরে লেনদেন জোরদার করতে ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন অগ্রগতির জন্য যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।’ তবে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এর বিস্তারিত বা কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।
ডিপ্লোম্যাট বলছে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘অপ্রত্যাশিত’ ঢাকা সফরটি বেশ ‘অদ্ভুত’ ছিল। কারণ, এটি প্রতি বছর জানুয়ারির প্রথম দিকে আফ্রিকান দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে চীনের দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ন করেছে। সেই জটিলতা এড়ানোর প্রয়াসেই হয়তো চীন ও বাংলাদেশ উভয়েই জোর দিয়ে বলেছে, এটি কোনো ‘অফিসিয়াল’ সফর ছিল না, এটি ছিল কেবলই একটি ‘স্টপওভার’ (যাত্রাবিরতি)।
কিন্তু নতুন বছরে কেবল নিজের প্রথম ব্যক্তিগত বৈঠকই নয়, দায়িত্ব নেয়ার পর কার্যত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেই এই প্রথম এ ধরনের বৈঠক করলেন শিন গ্যাং। যেটি হওয়ার কথা ছিল আফ্রিকান রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এটি যে একটি বড় বিষয় তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
অনানুষ্ঠানিক হোক কিংবা কেবলই যাত্রাবিরতি; ছিন গ্যাংয়ের সফরের সময়টিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই সময়ে ঢাকা সফর করছেন মার্কিন কর্মকর্তারাও। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সোমবার রাত ১টা ৫৮ মিনিটে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর দুজনের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে রাত ২টা ৫০ মিনিটের দিকে ঢাকা ত্যাগ করেন শিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন কী জরুরি বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন পড়ল যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মধ্যরাতে বিমানবন্দরে ছুটতে হলো?
এ বিষয়ে বেইজিংয়ের দেয়া বিবৃতি থেকে তেমন কিছু জানা না গেলেও বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন সংবাদমাধ্যধমকে জানান, ছিনের সঙ্গে তার আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর চীন থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করে। বিপরীতে চীনে বাংলাদেশের রফতানি ৮০ কোটি ডলারের নিচে আটকে রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের নড়বড়ে অবস্থার কারণে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য ঘাটতি ঢাকার জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পূরণ না করা প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে হতাশা স্পষ্ট ছিল আব্দুল মোমেনের মন্তব্যে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরে অনেক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও এর ছয় বছর পরও তার অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। চীনে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়েও আগের চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেন মোমেন।
বাংলাদেশের দিক থেকে আরেকটি শীর্ষ অগ্রাধিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাওয়া। মিয়ানমার থেকে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাস করছে, যাদের বেশিরভাগই সেখানে রয়েছেন ২০১৭ সাল থেকে যখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক অভিযান শুরু করে। এমন অতিরিক্ত বোঝার নিচে চাপা পড়া ঢাকা যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে এগিয়ে নিতে চায়। তবে মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আগের চেয়ে আরও কমে গেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
মিয়ানমারে নতুন সামরিক জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা বিদেশি সরকারগুলোর মধ্যে চীন অন্যতম এবং বাংলাদেশ চায়, রোহিঙ্গা ইস্যু উত্থাপনে সেই প্রভাব ব্যবহার করুক বেইজিং। রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধানে চীনের দিক থেকে বিশেষ ব্যবস্থা চেয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর বিনিময়ে বেইজিং-ওয়াশিংটনের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার বিষয়ে চীনকে আশ্বাস দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি বজায় রাখি। এটিই আমাদের নীতি।’ এ ছাড়া চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিনকে তিনি আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে আপনাদের প্রতি সমর্থন বাড়াবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তাদের নিজস্ব সমস্যা থাকতে পারে। এটি তাদের মাথাব্যথা, আমাদের নয়। আমরা উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাই।’
ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সব পক্ষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যে বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে ঢাকা হয়তো তা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। আব্দুল মোমেনের কথায়, ‘আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছি।’
সেদিক বিবেচনায়, বাংলাদেশে যখন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে ঠিক তখনই বাংলাদেশে ‘বিস্ময়কর’ যাত্রাবিরতি দিয়েছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গত ৭ জানুয়ারি চারদিনের সফরে ঢাকায় আসেন জো বাইডেনের বিশেষ উপদেষ্টা রিয়ার অ্যাডমিরাল এইলিন লউবেখার। ৯ জানুয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। এর মধ্যেই শনিবার বাংলাদেশ সফরে এসেছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু।
ডিপ্লোম্যাট বলছে, সংক্ষিপ্ত হলেও মার্কিন কর্মকর্তাদের এসব সফরই হয়তো চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিন গ্যাংকে ঢাকা সফরে অনুপ্রাণিত করেছে।
সম্ভবত মার্কিন কর্মকর্তাদের এসব সফরই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঢাকায় নামতে অনুপ্রাণিত করেছিল। একইভাবে, ছিনের সঙ্গে মধ্যরাতের কথোপকথন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনকে মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় কিছু ‘বাড়তি গোলাবারুদ’ জোগান দিতে পারে।
