এম, জুবায়ের মাহমুদ, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) :
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে খোলপেটুয়া নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় ও বহিরাগত একাধিক বালু ব্যবসায়ী বাণিজ্যিকভাবে বিক্রয়ের জন্য ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছে। সংগৃহীত বালু নওয়াবেকী বাজার, বেশকিছু জায়গায় গুদামজাতের পাশাপাশি বিভিন্ন ঠিকাদার ও ব্যক্তির চাহিদামতো সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের নাকের ডগায় দীর্ঘদিন এভাবে বালু উত্তোলন চললেও কেউ ‘টুঁ’ শব্দটি পর্যন্ত করছে না। বারবার ভাঙনের মুখে পড়া এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে প্রশাসন এমনকি পাউবোর সংশ্নিষ্টরা পর্যন্ত অজ্ঞাত কারণে নীরবতা পালন করছে। দুর্যোগপ্রবণ অংশ থেকে টানা বালু উত্তোলনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ভাঙন ও আতঙ্ক বাড়ছে।
সরেজমিন উপজেলার খোলপেটুয়া নদীতীরবর্তী বিড়ালাক্ষী, পাখিমারা, এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাঝ নদীতে একাধিক ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ছোট কাঠের নৌকা ও কার্গো মধ্যে বসানো ওই মেশিনের সহায়তায় নদীর গভীর থেকে বোরিং করে বালু উত্তালন করা হচ্ছে। একই সময়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নেওয়া হচ্ছে।
জানা যায়, বহিরাগত ও স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী খুলনার কয়রা এবং পাশের এলাকাগুলো থেকে ড্রেজার মেশিন আর কার্গোসহ ভাড়াটে শ্রমিক এনে নির্দিষ্ট অঙ্কের চুক্তিতে এসব বালু উত্তোলন করছে।
বালু উত্তোলনের কাজে জড়িত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উত্তোলনসহ নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতে দূরত্বভেদে বালু ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতি ফুট চার থেকে ছয় টাকা দিচ্ছে। পরে ওই বালু ফুটপ্রতি আট থেকে ১৪ টাকায় বিক্রি করছে। বালু ব্যবসায়ীদের দেখিয়ে দেওয়া অংশ থেকে তারা ‘হুকুমের গোলাম’ হিসেবে বালু উঠিয়ে দিচ্ছে বলেও তাদের দাবি।
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনকবলিত এলাকা হওয়ায় মানুষের দৃষ্টি এড়াতে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করছে সংশ্নিষ্টরা। স্থানীয় তহশিল অফিস, ঊর্ধ্বতন প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিরা অজ্ঞাত কারণে চুপ থাকায় মাসের পর মাস তারা বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে।
স্থানীয়রা জানান, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতরা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের কারও নাম কেউ মুখে আনতে চায় না।
বিড়ালাক্ষী গ্রামের একাধিক লোক জানান, গত এক যুগে অন্তত আটবার তাদের বেড়িবাঁধ ভেঙে চিংড়ি চাষের ঘের প্লাবিত হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, নওয়াবেকীর ফারুক, এবং রবিউল খোকন উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ।
নদী থেকে বালু উত্তোলনের পর একাধিক আড়তে গুদামজাতের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে তা সরবরাহ করছে। তারা আরও জানান, ফারুক,মজিদ সহ কিছু ব্যবসায়ী একাধিক কার্গো, ড্রেজার মেশিনসহ নিজস্ব সরঞ্জাম দিয়ে লাগাতার খোলপেটুয়া নদী থেকে দীর্ঘমেয়াদে বালু উত্তোলন করছে।
জনপ্রতিনিধিসহ জনপ্রশাসনকে নানাভাবে ‘ম্যানেজ’ করে তারা দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন স্থান থেকে বাধাহীন বালু উত্তোলনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলেও তাদের দাবি।
বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহূত কার্গোসহ যাবতীয় সরঞ্জাম নিজের নিশ্চিত করে ফারুক হোসেন জানান, সাতক্ষীরার এক ব্যবসায়ী ইজারা নেওয়া খোলপেটুয়া নদীর চর থেকে তাকে বালু উত্তালনের কাজ দিয়েছে। তার নওয়াবেকী গুদামের বালু ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে সংগৃহীত নয় বলেও তিনি দাবি করেন।
বালু উত্তোলনের কাজের সঙ্গে জড়িত রবিউল খোকন বলেন, প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে দূরের বালুমহালের অনুমতি থাকলেও যত্রতত্র বোরিং করে বালু উত্তোলন করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি আর কোন কথার উত্তর দেননি ।
তবে স্থানীয়দের দাবি, সাতক্ষীরার আশাশুনির চর বালুমহাল ঘোষণা সত্ত্বেও বেশি মুনাফার লোভে প্রভাবশালীরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভাঙনকবলিত খোলপেটুয়া নদী থেকে বালু উত্তোলন করছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা ভাঙনকবলিত এলাকার বালুকে বালুমহালের বলে চালিয়ে দিচ্ছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ নিয়ে আন্দোলন কারি মিসেস শামিমাজামান জানান, নদীভাঙনের ফলে প্রতি বছর শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। তারপরও নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ করা না হলে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি উপকূল রক্ষা বাঁধ কোনোভাবেই টিকবে না।
শ্যামনগর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে বলেন নদীর চর থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমাদের জানা নেই । এ নিয়ে তাদের কেউ অবহিত করেনি। এমনটি হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জড়িতদের ধরতে পারলে আইনের আওতায় আনা হবে।
